যেভাবে সহকর্মীদের জীবন রক্ষা করেছিলেন কনস্টেবল মোরশেদ

কনস্টেবল মোরশেদ আলমস্বীকৃতি কিংবা পদকের আশায় নয়, দায়িত্ব ও মানবিকতার অংশ হিসেবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিবহন বিভাগের কনস্টেবল চালক মোরশেদ আলম।। তবে ত্যাগের মূল্যায়ন পাওয়ায় তিনি অভিভূত এবং বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। গত বছরের ১৭ জানুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় রাজধানীর মৎস্য ভবনের পাশে পুলিশ বহনকারী যে বাসটিতে দুর্বৃত্তরা পেট্রোলবোমা হামলা চালিয়েছিল সেটার চালক ছিলেন তিনি।
মোরশেদ আলম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, চাকরি জীবনের ২৮ বছরে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হননি কখনও। জীবনে বেঁচে থেকে আবার গাড়ি চালাবেন এই আশাও তখন ছিল না। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও আরও ৫০ সহকর্মীর জীবন বাঁচানোর দিকেই ছিল তার লক্ষ্য।
মোরশেদ বলেন, বারডেম হাসপাতাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল এলাকায় দায়িত্ব পালনের জন্য গত বছরের ১৭ জানুয়ারি বিকালে রাজারবাগ থেকে রাতের টিম নিয়ে সেখানে যান। সারাদিন যারা ওই এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন তাদের নিয়ে রাত সাড়ে ৭টার দিকে আবার রাজারবাগের উদ্দেশে রওয়ানা হন। এ সময় তার বাসে ৪০ জন পুলিশ সদস্য ছিলেন।
শাহবাগ থেকে মৎস্য ভবনের কাছাকাছি রমনা রেস্তোরাঁর কাছে পৌঁছামাত্রই বাসটি (নং-ঢাকা মেট্রো স-১১-০০৮৬) লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা একের পর এক পেট্রোলবোমা ছুড়ছিল। এরইমধ্যে গাড়ির এক পাশে আগুন ধরে যায়। একটি বোমা গাড়ির ভেতরে ইঞ্জিনের ওপর পড়ে। দ্রুত সেই জ্বলন্ত বোমাটি হাত দিয়ে বাইরে ছুড়ে মারেন মোরশেদ আলম। একইসঙ্গে গাড়িটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টাও করতে থাকেন একাই। এ সময় বাসটির অন্য পুলিশ সদস্যরা জীবন বাঁচাতে বাস থেকে যে যেভাবে পারছেন লাফিয়ে পড়েন। এতে আঘাত পেয়ে ও আগুনে দগ্ধ হয়ে ২০ জনেরও বেশি আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঘটনার ১৯ দিন পর মারা যান কনস্টেবল শামীম মিয়া। তিনি মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছিলেন।

বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মোরশেদ আলম।। তিনি বলেন,  যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাসের আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিলেন তিনি, তখনও তাকে লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তরা পেট্রোলবোমা ছুড়ে মারে। এতে তার মুখ, কান ও হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে দগ্ধ হয়। তখন ভেবেছিলেন আর বুঝি বেঁচে থাকা হলো না। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ও রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন দীর্ঘ পাঁচ মাস। এখন মোটামুটি সুস্থ। নিয়মিত দায়িত্বও পালন করে যাচ্ছেন। তবে নিয়মিত ওষুধ খেতে হচ্ছে। পোড়া ক্ষতের যন্ত্রনা এখনও তাকে কষ্ট দেয়।

নাবিল ও নাফিস নামের দুই শিশু সন্তানের জনক মোরশেদ আলমের বাড়ি ময়মনসিংহ সদরে। ১৯৮৮ সালের অক্টোবরে পুলিশের পরিবহন বিভাগে কনস্টেবলের (মেকানিক) চাকরিতে যোগ দেন। এরপর চালক হিসেবে পদোন্নতি হয়। তার অনুরোধ, শত্রুর গাড়িতেও যেন কেউ এভাবে পেট্রোলবোমা হামলা না চালায়। তারা তো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বই পালন করছিলেন। 

এ ঘটনায় সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য মোরশেদ আলমকে বাহিনীর পক্ষ থেকে ‘বীর’ আখ্যায়িত করে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম)’ দেওয়া হয়। পদক দেওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়- ‘জীবনের মায়া ত্যাগ করে সরকারি সম্পদ ও পুলিশ সদস্যদের প্রাণ রক্ষা করে তিনি বীরের ভূমিকা পালন করেছেন। তার সাহসিকতার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ‘বিপিএম’ পদকে ভূষিত করা হলো।

ডিএমপি এলাকায় সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের জন্য বিপিএম পদক দেওয়া হয় কনস্টেবল শাহিদুর রহমানকেও। তিনি ডিএমপি’র পিওএম দক্ষিণ বিভাগে কর্মরত ছিলেন। গত ২২ অক্টোবর রাতে রাজধানীর গাবতলী এলাকায় চেকপোস্টে দায়িত্ব পালন করছিলেন তারা। রাত সাড়ে ৯টার দিকে তিনজনকে তল্লাশির সময় এক দুর্বৃত্ত এসআই ইব্রাহিম মোল্লাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। পরে ইব্রাহিম মোল্লা মারা যান। তিন দুর্বৃত্তের একজনকে পালিয়ে যাওয়ার সময় হাতে-নাতে আটক করেন শাহিদুর।

এছাড়া মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের বোম ডিসপোজাল ইউনিটের কনস্টেবল জাহিদুর রহমানকে বিপিএম পদক দেওয়া হয়। গত বছরের ২৩ মার্চ বোমা ও বিস্ফোরকের নমুনা সংরক্ষণ করতে গিয়ে বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হন তিনি।

/এএইচ/এপিএইচ/