ঠিক এমন পরিবেশেই বেড়ে উঠছে রাজধানীর শিশুরা। অভিভাবক আর বিশেষজ্ঞরা এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলেও শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি বা এ পরিস্থিতির উন্নয়নে নেই কোনও উদ্যোগ। ফলে শৈশবের দুরন্ত সময়ের আনন্দ আর প্রকৃতির স্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়ে অপরিপূর্ণতা নিয়ে শুরু হচ্ছে এই প্রজন্মের। ওদের মানসিক ও শারিরীক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, হয়ে উঠছে আত্মকেন্দ্রিক আর অসহনশীল। অনেক অভিভাবকই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু কংক্রিটের এই শহরে এর সমাধান কী তা তারা জানেন না। ইচ্ছে থাকলেও তারা শিশুদের ভালো পরিবেশ দিতে পারছেন না, তাই নিরুপায় হয়েই স্রোতে গা ভাসিয়ে চলার চেষ্টা করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিবেশের কারণে শিশুরা শরীর ও মনে অপরিপূর্ণতা নিয়ে বেড়ে উঠছে। শ্রদ্ধা, সহনশীলতা, বিনয় এসব মানবিক বিষয়ে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
পান্থপথে অবস্থিত একটি ক্যাফের প্লেজোনে নার্সারি পড়ুয়া ছেলে আয়ানকে নিয়ে এসেছেন ব্যাংক কর্মকর্তা সাদাফ ইসলাম। শিশুদের এই প্লেজোনের প্রতি আসক্তির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরের বিনোদন পার্কগুলো অনেক দূরে। বাচ্চাদের নিয়ে সেখানে সময় পেলেই চলে যাওয়া সম্ভব নয়। শহরের মধ্যেই শিশুদের উপযোগী পার্ক থাকলে আমার সন্তানকে নিয়ে এই প্লেজোনে আসতাম না।’
তিনি আরও বলেন, ‘সারাদিন ওরা বসে কাটায়, গেমস খেলতে এসেও তাই করছে। এতে করে চোখে প্রভাব পড়ছে। সর্বোপরি সহিংসতা শিখছে। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণ কী, সেটা জানি না।’
মগবাজারের একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নুসাইবা। বাসা ডাক্তার গলিতে। বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব হাঁটা পথে ১০ মিনিট। অথচ এই দূরত্বটুকুই ওদের জন্য অনেক।
নুসাইবার মা লাবনী বলেন, ‘আমরা মফস্বল শহরে মাইলের পর মাইল দল বেঁধে স্কুল-কলেজে হেঁটে গিয়েছি। কোনও ক্লান্তি ছিল না, বরং বাড়ি ফিরলেই মনে হতো আরও হাঁটা গেলে ভালো হতো।’
ঢাকা শহরে জন্মের পর থেকেই শিশু-কিশোরদের খাঁচাবন্দি জীবন শুরু হয়। স্কুলে যায় খাঁচার মতো ভ্যানে করে, বাসায় ফিরে বন্দি হচ্ছে ছোট গ্রিলে ঘেরা এক টুকরো বারান্দায়। শিশুদের জন্য খেলাধুলার মাঠ নেই, যে কয়টি স্কুলে খেলার মাঠ রয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগই স্কুলের শিশুদের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। অপরিচ্ছন্ন-নোংরা পরিবেশ আর মাদকসেবীদের দখলে থাকায় সেখানে তাদের বিচরণ হয় না বললেই চলে। যার ফলে শিশু-কিশোররা হয়ে পড়ছে ঘরোয়া বিনোদন নির্ভর। সেখানে তাদের প্রধান মাধ্যম টেলিভিশন, কম্পিউটার, ফেসবুক। অর্থাৎ প্রযুক্তি নির্ভর বিনোদন।
বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য, শহরের শিশুরা এখন আর মাঠে ঘুরে বেড়ায় না, ছুটে বেড়ায় না দিগন্তজোড়া স্কুলমাঠে। এখন শিশুদের শৈশব কাটে ভিডিও গেমস খেলে। যার কারণে শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটছে না। বাস্তব দুনিয়া সম্পর্কে তাদের ধারণাও নেই, খেলাধুলা না করাতে শিশুরা বাড়ছে স্থূলকায় শরীর নিয়ে। যেখানে বাসা বাঁধছে নানা রোগ।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর থেকে জানা যায়, ঢাকায় ৩৩৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর প্রায় ৪শ’ বিদ্যালয় এবং ১১ হাজারের বেশি কিন্ডারগার্টেন রয়েছে। সরকারি স্কুলগুলোতে ছোট খেলার মাঠ থাকলেও বেসরকারি স্কুল, কিন্ডারগার্টেন কিংবা নামি-দামি ইংশিল মিডিয়াম স্কুলগুলোর শতকরা ৯৮ ভাগেরই খেলার মাঠ নেই। এসব স্কুলের বার্ষিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয় অন্য মাঠে। স্কুল অনুমোদন নীতিমালার ভেতরে খেলার মাঠ থাকা বাধ্যতামূলক হলেও ঢাকার বেশিরভাগ স্কুলেই শিশুদের খেলার মাঠ নেই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইফফাত আরা শামসাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খেলাধুলা না করাতে শিশুরা স্থূলকায় হয়ে যাচ্ছে, আমরা যাকে বলি ওবেসিটি। এই ওবেসিটির কারণে পরবর্তী সময়ে তারা হাই ব্লাডপ্রেসার, অল্প বয়সে ডায়াবেটিক, দুর্বলতা, চোখের সমস্যার মতো শারীরিক ঝুঁকিতে পড়ছে।’
এ প্রসঙ্গে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে সমাজের অনেক পরিবর্তন দেখছি আমরা। সাংস্কৃতিক, সামাজিক মূল্যবোধ ও অপরাধ জগতের নানা পরিবর্তন এসেছে। এর প্রধান কারণ, আমাদের ভেতরে সুকুমার বৃত্তির চর্চা কমে গেছে অনেকখানি। একজন মানুষ বিকশিত হয় সামাজিক, আধ্যাত্মিক, শারীরিক ও মানসিকভাবে। কেবলমাত্র শারীরিক বিকাশ ছাড়া বাকি বিকাশগুলোর জন্য পরিবেশের প্রয়োজন অপরিসীম। শহুরে চাপের কারণে শিশুদের এমন বিকাশ হচ্ছে না। তারা এককেন্দ্রিক ভোগবাদী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। অন্যের প্রতি ভালোবাসা, কারও বিপদে এগিয়ে আসা, সহানুভূতি থাকছে না, সৃষ্টিশীল-সৃজনশীল হচ্ছে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সেলিম হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খেলাধুলা শিশুদের অবরূদ্ধ আবেগকে রিলিজ করে। শিশুরা যদি খেলতে না পারে তাহলে তাদের ভেতরে এসব আবেগগুলো জমতে থাকে। যেগুলো পরবর্তী সময়ে ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সেটা শুধু অন্যের ওপরেই নয়, নিজের ওপরেও প্রয়োগ করে শিশুরা। এ ধরনের ‘সেলফ হার্ম বিহেবিয়ার’ বেড়ে যায়।’
/এসটি/এজে/