মুহূর্তের মৃত্যুশঙ্কায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থী

দেয়ালে শেওলা ধরা একটি ভবনের সামনের অংশবিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই নিজ উদ্যোগে বানানো ছাত্রাবাসে থাকতে হচ্ছে রাজধানীর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে। স্যাঁতসেঁতে পুরনো বাড়িতে ভূমিকম্পের ভয় নিয়ে থাকতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী নতুন চাকুরে ব্যাচেলর, প্রাইভেট মেডিকেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীরা। সব মিলিয়ে সে সংখ্যা লাখের কম নয়। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশকিছু হলও ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

সম্প্রতি ভূমিকম্পের দিন পীরেরবাগের ৬৬৯ নম্বর বাড়ির ছাদের একটা অংশ ধসে পড়ে। গণমাধ্যমের কাছে জানালে বাড়িওয়ালা বের করে দেবেন বলে সে খবরও জানাতে পারেননি ওই বাড়িতে মেস করে থাকা শিক্ষার্থীরা।

কেন এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় থাকছেন, জানতে চাইলে রায়হান নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বলতে আপনারা বড়লোক ভাবলেও মধ্যবিত্তের ছেলেমেয়েরা এখানে পড়ে। আমার বাবা-মার অত টাকা নেই। টিউশনি করে কিছু উপার্জন করলেও ব্যাচেলর বলে ফ্ল্যাট ভাড়া পাওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে আর কী করার আছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকা শহরে বড় ধরণের বিপর্যয় নেমে আসবে। এর মধ্যে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ (মিটফোর্ড) হাসপাতালও আছে। এমনকি সচিবালয়ের কিছু ভবনও ভেঙে পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকার ২৫ হাজার মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে ভবনচাপা পড়ে মারা যাবেন, আহত হবেন প্রায় এক লাখ, যাদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী।

ঢাকার পূর্ব ও পশ্চিম অংশের কিছু এলাকা আবার ভূমিকম্পের বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, যেগুলো ৫.৬ মাত্রার ভূমিকম্পেই মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে। পশ্চিমে মিরপুর থেকে পাগলা এবং পূর্বে উত্তরখান থেকে ডেমরা পর্যন্ত এলাকাগুলো এই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এসব এলাকায় শিক্ষার্থীদের বসবাস বেশি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি মেডিকেল কলেজ ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সরকারি কলেজ আছে এই মহানগরে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) দেওয়া তথ্য মতে, এ ১১টি প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত প্রায় দেড় লাখ শিক্ষার্থী। এ ছাড়া বেসরকারি ৩৮টি মেডিকেল কলেজের ৩২টি আর বেসরকারি ৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫২টির অবস্থান ঢাকায়। এগুলোর কোনোটিরই পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা নেই। আছে এইচএসসির পর মেডিকেল আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছু প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থীর চাপ।

এদের জায়গা হয় রাজধানীর একটু ভেতরের এলাকার পুরনো বাড়িঘরে, বিশেষ করে কমলাপুর, ফার্মগেট, শান্তিনগর, মগবাজার, মালিবাগ, আজিমপুর, লক্ষ্মীবাজার, ওয়ারী, মোহাম্মদপুর, তেজগাঁও, শাহবাগের আজিজ মার্কেট, কল্যাণপুর, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, বাসাবো ও খিলগাঁও এলাকায়। ফার্মগেট এলাকায় ৫তলা ভবনে একইসঙ্গে দোকান, ফার্মেসিতে ভর্তি যে ভবন সেখানেও কোচিংয়ে আসা শিক্ষার্থীদের থাকতে হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর এলাকায় যেসব তিন-চারতলা ভবনে মেসবাড়ি করা হয়েছে, সেগুলো আসলে আশির দশকে হাউজবিল্ডিং লোন নিয়ে করা। অযত্নে এসব ভবনের দেয়ালে নোনা ধরেছে, বাসার বাইরে পলেস্তঁরা উঠে গেছে। এসব বাড়িতে শিক্ষার্থীদের থাকার অনুমতি মিললেও কোনভাবেই কম ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। পুরনো চার রুমের ফ্ল্যাটের জন্য কুড়ি হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া দিতে হয়।

মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতায় তিন ব্যাচেলর থাকেন চিলেকোঠায়। ওপরে টিন, পাশে নোনাধরা দেয়াল। এমন দৃশ্য ওই এলাকার সবখানেই। আজিমপুরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থী একসঙ্গে থাকেন। তাদের জন্য বাসার অন্যদের চেয়ে ভিন্ন নিয়ম করেছেন বাড়িওয়ালা। গত বারো বছরে এ বাসায় কোনকিছু মেরামত করা হয়নি। চারদিকে বহুতল ভবন থাকায় নিচতলায় দিনের বেলায়ও থাকে ঘুঁটঘুঁটে অন্ধকার। মেঝে থাকে সারাক্ষণ স্যাঁতসেঁতে।

পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, ‘ঢাকায় পরিত্যক্ত ভবনগুলোতেই গাদাগাদি করে অনেক পরিবার থাকে। সেই ঢাকায় আপনি কীভাবে এই শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করবেন? বিভিন্ন ধরণের অফিস, ফ্যাক্টরি, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি ঢাকার বাইরে নিতে না পারলে আমাদের এই নগরীতে এভাবেই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচতে হবে। একটা পুরো প্রজন্ম ধংসের মুখোমুখি রোজ বাঁচছে, তাদের জন্য করণীয় নেই, এটা দুঃখজনক।’

এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগামীতে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে মেয়েদের কয়েকটা হল হুমকির মুখে পড়ে যাবে। কেউ যেন ভয় না পায়, সে কারণে এখন লুকিয়ে রাখা হলেও সেটা বড় ক্ষতির দিকেই দিকেই যাচ্ছে।’

/ইউআই/এজে/