সাত খুনের ঘটনার বিচার সবে মাত্র শুরু হলেও মূল আসামি নূর হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা ১১টি মামলার মধ্যে সোমবারই এক সঙ্গে চারটি মামলায় জামিন পেয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন বাংলা ট্রিবিউনকে এই খবরটি নিশ্চিত করেছে।
সোমবার সাত খুনের দুটি মামলার চার্জ গঠনের সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা এর সঙ্গে প্রধান আসামি নূর হোসেন জড়িত না বলে এর সপক্ষে অনেক যুক্তি তুলে ধরেন। আসামি পক্ষের শুনানিতে অংশ নেন মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, প্রাক্তন পিপি সুলতানুজ্জামান, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এমএ রশিদ ভূঁইয়া, সুপ্রিম কোর্টের সাবেক অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফউজ্জামানসহ অর্ধশত আইনজীবী।
এ ব্যাপারে বাদী পক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, চার্জশিটের ত্রুটির কারণেই আসামি পক্ষের আইনজীবীদের পক্ষে এটা করা সম্ভব হয়েছে।
চার্জ গঠনের সময় নূর হোসেনসহ সাত খুনের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া ২৩ জনই নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে উপস্থিতিতে ছিলেন। এসময় নূর হোসেনকে বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা গেছে।
শুনানির সময় আসামিপক্ষের আইনজীবী খোকন সাহা যুক্তি তুলে ধরে বলেন, ‘আসামি তারেক সাঈদ, এমএম রানা ও আরিফ হোসেনকে যেভাবে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে সেটা আইনসিদ্ধ ছিল না। তাদের নির্যাতন করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া নূর হোসেনের বিরুদ্ধে হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কোনও প্রমাণ নেই। টাকা লেনদেনের বিষয় তুলে ধরা হলেও তার বিবরণ নাই। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রভাবিত হয়ে নির্যাতন করে আসামিদের কাছ থেকে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি আদায় করেছেন। নূর হোসেন মেজর আরিফকে চিনতেন না। বাংলাদেশের কোথাও সোর্সকে কোনও মামলার আসামি করার নজির নেই। এছাড়াও যে ষড়যন্ত্রের কথা বলা হয়েছে তারও কোনও প্রমাণ নেই। আমরা এই চার্জশিট বিশ্বাস করি না।’
এ ব্যাপারে খোকন সাহা বলেন, ‘আমি তো আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে কোর্টে দাঁড়াইনি। আমি একজন পেশাদার আইনজীবী। একজন আইনজীবী হিসেবেই কোর্টে দাঁড়িয়েছি। আইনের অধিকার সবারই আছে।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, উচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়ে ছিলেন তদন্তকারী সংস্থা আরও অধিকতর তদন্ত করতে পারেন। কিন্তু সেটা তদন্তকারী সংস্থা আমলে নেয়নি। ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিট দিয়ে বিচার শুরু হয়েছে। যার ফলে আসামি পক্ষের অনেক সুযোগ থেকে যাচ্ছে।
প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা সম্পর্কে সাখাওয়াত হোসেন বলেন,‘প্রশাসনের নূর হোসেনের প্রতি আগে যে আনুকূল্য ছিল এখনও আছে। আমরা অভিযোগ পত্রের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে নারাজি দিয়ে ছিলাম। তার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এ অভিযোগ পত্রে ১২০ ধারার (খ) সংযোজন করা যেতে পারে বলে জানিয়ে ছিলেন। ১২০ ধারা হলো পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র। পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের বিষয় আনতে হলে অবশ্যই নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। উচ্চ আদালত থেকে বলা হয়েছে পুলিশ চাইলে অধিক তদন্ত করতে পারে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপারের আদেশের কপি হাতে না পেয়েই মিডিয়ার মাধ্যমে জেনে আগেই বলে দিয়েছেন, ‘এ অভিযোগ পত্রের সুষ্ঠু তদন্ত হয়েছে আর কোনও তদন্তের প্রয়োজন নেই। নূর হোসেনকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কারণ নূর হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এ মামলার রাঘববোয়ালরা বের হয়ে আসতো।’
আদালতে মেজর (অব.) আরিফ হোসেনের পক্ষে জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুর রশিদ ভূঁইয়া এবং আলী আহাম্মদ ভূঁইয়া, লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানার পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফরহাদ, অ্যাডভোকেট খোকন সাহাসহ বাকি আসামিদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের সাবেক অ্যাডিশনাল অ্যাটর্নি জেনারেল আশরাফউজ্জামান, অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন, অ্যাডভোকেট একরামুল হক, অ্যাডভোকেট রঞ্জিত কুমার রায়, অ্যাডভোকেট আফসারউদ্দিনসহ ৩০-৪৫ জন আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেন এবং তাদের নির্দোষ দাবি করে চার্জ গঠন থেকে অব্যাহতির আবেদন জানান। শুনানি শেষে আদালত আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির ১৭টি পদের মধ্যে সভাপতি ও সেক্রেটারিসহ ১৩ পদেই আছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। সেই সমিতি থেকে বলা হয়েছে, যে কোনও আইনজীবী যে কারও পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অধিকার রাখেন। নূর হোসেনের পক্ষে কেউ আইনি লড়াই চালালে বাধা দেওয়া হবে না। সেই বক্তব্যের প্রতিফলন সোমবার দেখা গেছে। কারণ সেদিন খোকন সাহা সরাসরি নূর হোসেনের পক্ষে ওকালতনামায় স্বাক্ষর করেছেন।
নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী কাউন্সিলর সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন, ‘কিছু কিছু আইনজীবীকে দেখেছি যারা এক সময় ৭ খুনের আন্দোলনের সঙ্গে ছিলেন। এখন দেখা যাচ্ছে তারা দূরে সরে গেছেন।’
৪ মামলায় জামিন
এদিকে নূর হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের করা ৪টি মামলায় তিনি জামিন পেয়েছেন। সোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে শুনানি শেষে বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন মামলার জামিনের আদেশ দেন।
অ্যাডভোকেট খোকন সাহা জানান, ২টি চাঁদাবাজি, একটি মাদক ও একটি অস্ত্র আইনের মামলায় নূর হোসেন জামিন পেয়েছেন।
এ ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের পিপি ওয়াজেদ আলী খোকন জানান, জামিনযোগ্য মামলা হওয়ায় আদালত ৪টি মামলায় নূর হোসেনকে জামিন দিয়েছেন।
সাত খুনের একটি মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি বলেন,‘নূর হোসেন আমাদের এখন আতঙ্কিত করে ফেলেছেন। মামলার বাদী ও বাদীর আত্মীয়-স্বজনরা নিরাপত্তার অভাব বোধ করছেন। তাদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীদের নূর হোসেনের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। এসব কারণে আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।’
/জেবি/টিএন/
/আপ: এইচকে/