নূর হোসেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রে তার ত্যাগ অবিস্মরণীয়। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বুকে ও পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। একপর্যায়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। তার এই ত্যাগের ইতিহাস স্মরণ করে রাখতে প্রথমে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন ‘ঐতিহাসিক ১০ নভেম্বর’ ও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো দিনটিকে ‘নূর হোসেন দিবস’ হিসেবে পালন করতে শুরু করে।
নূর হোসেনের এই ত্যাগ স্বৈরাচার মুক্ত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখে। নূর হোসেনে নিহত হওয়ার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৯৯৬ সালে তার পরিবারকে মিরপুর-১ মাজার রোডে পূর্ণ বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। নূর হোসেনের ভাইয়েরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদ পান।
২০০৪ সালে নূর হোসেনের বড় ভাই আলি হোসেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। একই বছর তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী মোটরচালক লীগ গঠন করে তার অনুমোদন নিয়ে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভাপতি হন।
সরেজমিন জানা গেছে, সম্প্রতি নূর হোসেনের নামে একটি স্মৃতি ফাউন্ডেশন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয় পরিবার। যদিও এখন পর্যন্ত কোনও সংগ্রহশালা করতে পারেননি তারা। প্রতি বছর ১০ নভেম্বর পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে মিলাদ আর নূর হোসেনের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। সম্প্রতি জনকল্যাণে ‘নূর হোসেন স্মৃতি ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে পরিবারের পক্ষ থেকে।
মাজার রোডে নূর হোসেনের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে দেখা যায়, মেইন রোড ঘেঁষা নির্মাণাধীন এক বিল্ডিংয়ে তার ভাইয়েরা পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন। একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে বহুতল ভবন তৈরির দায়িত্ব দিলে তারা কাজ সম্পূর্ণ না করে বিভিন্ন জনের থেকে ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। সে কারণে ভবনের কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে নূর হোসেনের স্বজনদের সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করেননি।
মূল ভবনের পাশেই আরেকটি ছোট দোতলা ভবন রয়েছে। নূর হোসেনের পরিবারের দাবি, এটি তাদের মূল জমির একাংশ, যা ঠিকাদার কোম্পানিকে দেওয়া হয়নি। আর এই ভবনের নিচতলার পিছনে এক রুমের অফিস নিয়ে বানানো হচ্ছে ‘নূর হোসেন স্মৃতি ফাউন্ডেশন’। যার কার্যক্রম এখন শুরু হয়নি। তবে নূর হোসেন দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন ব্যানার টানানোর প্রস্তুতি চলছে।
কথা বলার জন্য টানা তিনদিন বাড়িতে গিয়ে যোগাযোগ করে নূর হোসেনের কোনও ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাননি এই প্রতিবেদক।
নূর হোসেনের মা অসুস্থ থাকায় দেখা করতে চাননি। নূর হোসেনের বড় ভাই প্রথমে ফোন ধরলেও পরে যোগাযোগ করবেন বলে জানান। তবে তিনি আর যোগাযোগ করেননি। পরে বিল্ডিংয়ের ম্যানেজারের মাধ্যমে ফোন দিলে নূর হোসেনের ছোট ভাই দেলোয়ার হোসেনের ছেলে জাওয়াদ হোসেন এসে কথা বলেন। তিনি নূর হোসেনের স্মৃতি নিয়ে কিছু বলতে পারেননি। তার বক্তব্য, ‘চাচার ওই ঘটনার সময় তো আমি জন্মই নেইনি। তবে দাদি-বাবার কাছ থেকে চাচার ত্যাগের কথা শুনেছি।’
ত্যাগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাওয়াদ বলেন, 'এই তো, গণতন্ত্রের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।‘
নূর হোসেন দিবসে কোনও আয়োজন হয় কিনা পরিবারের পক্ষ থেকে জানতে চাইলে জাওয়াদ বলেন, ১০ নভেম্বর এলে আমরা মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করি স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও জনসাধারণকে নিয়ে। এছাড়া এদিন সকালে চাচার কবর জিয়ারত এবং ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাই।
নূর হোসেন স্মৃতি ফাউন্ডেশনের বিষয়ে জাওয়াদ বলেন, অনেক দিন ধরে চেষ্টা করছি নূর হোসেনের নামে কল্যাণকর কিছু করা যায় কিনা। এই চেষ্টা থেকেই নূর হোসেন স্মৃতি ফাউন্ডেশন করেছি। কিন্তু এখনও কার্যক্রম শুরু হয়নি। তবে এবারের দিবসটি পালনের পরেই আমরা কার্যক্রম শুরু করবো।