ভাষার মাসে কওমি শিক্ষার্থীদের দেয়ালিকা চর্চা

মাদ্রাসার দেওয়ালে টানানো পত্রিকাফেব্রুয়ারি এলেই হাতে লেখা দেয়ালিকা চর্চা শুরু হয় দেশের কওমি মাদ্রাসাগুলোয়। নিয়মিত ক্লাস ও ধর্মভিত্তিক কাজের বাইরে সময় করে দেয়ালিকার কাজে যুক্ত হন শিক্ষার্থীরা। নানা রঙের বিভিন্ন ছবি এঁকে দেয়ালিকার শোভাবর্ধনও করা হয়। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মাদ্রাসাগুলোর সামনে টানানো বোর্ডে দেয়ালিকা টাঙানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাজধানীর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মাদ্রাসায় গিয়ে দেয়ালিকা দেখা গেছে। ঢাকার বাইরেও অনেক কওমি মাদ্রাসায় দেয়ালিকা করার খবর মিলেছে। তবে, শহরের মাদ্রাসাগুলোয় বেশি দেয়ালিকার চর্চা হয় বলে মাদ্রাসা সূত্রে জানা গেছে।
জানা গেছে, এসব দেয়ালিকার ব্যয়নির্বাহ করা হয় শিক্ষার্থীদের চাঁদার অর্থে। দেয়ালিকাগুলোয় প্রতিষ্ঠানের উচ্চপর্যায় থেকে শিশুশ্রেণির শিক্ষার্থীদের নানা রকম সৃজনশীল রচনা সুন্দর হস্তাক্ষরে উপস্থাপন করা হয়।
রাজধানীর ঢাকা উদ্যানসংলগ্ন জামিয়াতুল আজিজ আল ইসলামিয়া মাদ্রাসার দোতলায় একটি বাঁধাই করা বোর্ডে টানানো হয়েছে ‘আল আযীয’ শিরোনামে দেয়ালিকা। এতে মাদ্রাসার বিভিন্ন শিক্ষার্থীর লেখা প্রকাশিত হয়েছে।দেয়ালিকাটির সম্পাদক আবদুল্লাহ আল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা প্রতি বছরই দেয়ালিকা বের করি। তিনি বলেন, আমাদের মাদ্রাসার দেয়ালিকার খরচ নিজেরাই বহন করি। নিজেরা ১০ টাকা, ২০ টাকা চাঁদা তুলি। এভাবেই হয়। কলম-কাগজ, পেন্সিল কিনতে আর কত টাকা লাগে!

মোহাম্মদপুর সাত মসজিদ রোডের পেছনে অবস্থান জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসার। প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়মিত এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ ছাত্র কাফেলার তত্ত্বাবধানে  আলোর মিছিল নামে একটি দেয়ালিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে।

দেওয়ালিকাটির সম্পাদক আবু নাঈম ফয়জুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা প্রতি বছর ভাষার মাসকে সামনে রেখে দেয়ালিকা করি। দেয়ালিকা বের করার আগে মাদ্রাসার নোটিশ বোর্ডে ছাত্রদের লেখা আহ্বান করা হয়। ওই লেখাগুলো থেকে বাছাই করে দেয়ালিকায় প্রকাশ করা হয়। প্রায় এক বছরের মতো এই লেখাগুলো সবাই পড়ার সুযোগ পান।দেওয়ালিকা পত্রিকা

রাহমানিয়া মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস ক্লাসের এক শিক্ষার্থী জানান, এই প্রতিষ্ঠানেও ছাত্র সংসদের নেতৃত্বে ও তত্ত্বাবধানে দেয়ালিকা প্রকাশ করা হয়। পাশাপাশি একজন শিক্ষককে দেয়ালিকার বিষয়ে পরামর্শক হিসেবে রাখা হয়।
এই মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী মাওলানা এহসানুল হক বলেন, ছাত্রদের বাইরে রাহমানিয়া মাদ্রাসা থেকে ‘রাহমানী পয়গাম’ নামে একটি ইসলামি পত্রিকাও প্রকাশিত হয়। ওই পত্রিকাটিও মাতৃভাষার নানা বিষয়ে, স্বাধীনতার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে প্রকাশিত হয়।

ঢাকার মতো চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ ইসলামি প্রতিষ্ঠান জামেয়া দারুল মা'আরিফ আল-ইসলামিয়াতেও নিয়মিত দেয়ালিকা বের হয়। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী তারেক সিদ্দিকী ও আবদুল্লাহ আল-মামুন জানান, এ মাদ্রাসা থেকে প্রত্যেক মাসে প্রত্যেক ক্লাস থেকে দেয়ালিকা বের হয়। আরবি, ইংরেজি, উর্দু, বাংলায়। তবে, বাংলা ও আরবি পত্রিকা নির্দিষ্ট।

তারা জানান, মাদ্রাসার সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ফোরাম ‘আন-নাদী আস-সাক্বাফীর’ ব্যবস্হাপনায় দেয়ালিকা বের হয়।

লেখা

ফেব্রুয়ারিতে ভাষার মাস উপলক্ষে মুকুল ও রক্তাক্ত ফাল্গুন শিরোনামে দুটি দেয়ালিকা বের করেছে দারুল মা’রিফের শিক্ষার্থীরা। যথাক্রমে আলাউদ্দিন ও নিজামুদ্দিন নামে দুজন শিক্ষার্থী পত্রিকা দুটো সম্পাদনা করেছেন। এছাড়া ময়ূখ নামেও একটি দেয়ালিকা বের করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় পত্রিকাগুলোয় গল্প, প্রবন্ধ, ছড়া, কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। লেখাগুলোর বিষয়ের মধ্যে একুশ, স্বাধীনতা, ফাল্গুন উল্লেখযোগ্য।

তারেক সিদ্দিকী জানান, দারুল মা’রিফ থেকে আল-হক নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি সংখ্যা কিছুদিন পর বের হবে। তিনি জানান, ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আরও দেয়ালিকা বের হবে।

এদিকে, ঢাকার আজিমুপর ফয়জুল উলুম মাদ্রাসা, মিরপুর-১৩ খাদিমুল উলুম মাদ্রাসা, মালিবাগ জামিয়া শরইয়্যা মাদ্রাসায়ও শিক্ষার্থীরা দেয়ালিকা প্রকাশ করেছে। এছাড়া, ঢাকার বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দারুল আরকাম, জামিয়া ইউনূছিয়া, সিলেটের কাজিরবাজার মাদ্রাসা, গহরডাঙ্গা ফরিদপুর মাদ্রাসায় দেয়ালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলেও মাদ্রাসাগুলোর সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দেওয়ালিকা হাতে শিশু শিক্ষার্থীরা

যদিও গত ডিসেম্বরে বিজয়ের মাসে মাদ্রাসাগুলো থেকে প্রকাশিত ইসলামি পত্রিকাগুলোয় বিজয় দিবস অবহেলিত থাকলেও ফেব্রুয়ারিতে সে চেহারা নেই।

এ ব্যাপারে তরুণ লেখক ও প্রাবন্ধিক মাওলানা সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, মাদ্রাসায় ভাষা নিয়ে দেয়ালিকা সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। বহু পুরনো। মহা আয়োজন, উল্লাস করে এই পত্রিকা করা হয়। রাতভর জেগে থেকে, নানা উত্তেজনায় দেয়ালিকা ছাত্রদের সামনে উন্মোচন করা হয়। বিষয়গুলো এতদিন সামনে আসেনি। মাদ্রাসা-শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পড়ার বাইরেও কবিতা, গল্প লেখেন। বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন।

/এমএনএইচ/