বেতারে পূর্ব পাকিস্তানকে যেসব বার্তা দেন ইয়াহিয়া

তখন ডিসেম্বরের শুরু। যুদ্ধ চলছে সমানে। এখানে- ওখানে শেলিং শুরু হয়ে গেছে। ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে হাতে-হাত ও কাঁধে-কাঁধ মিলিয়ে একের পর এক অঞ্চল মুক্ত করে চলেছে। অথচ তখনও নিয়মিতভাবে বেতারে প্রচারিত হচ্ছিল ইয়াহিয়া খানের ভাষণ। পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধরত পাক বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের উদ্দেশে তিনি বার বার বলছিলেন, ‘আপনারা শান্ত থাকুন, ধৈর্য ধরুন। জয় আমাদের হবে। পাকিস্তানের পক্ষে সত্য ও ন্যায় রয়েছে। শত্রুকে জানিয়ে দেওয়া উচিত যে, প্রতিটি পাকিস্তানি প্রিয় আবাসভূমি রক্ষার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত। আমাদের নির্ভীক সশস্ত্র বাহিনী অসম সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুর এগিয়ে যাওয়া রোধ করে দিয়েছে। যুদ্ধের বিজয় সৈন্য সংখ্যা ও অস্ত্রশস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না, ঈমানের শক্তি, উচ্চ আদর্শ ও সর্বশক্তিমানের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল।’

মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, ইয়াহিয়া কেবল এই সময়টাতেই প্রায় প্রতিদিন নতুন নতুন বার্তা দিতেন ঠিকই, কিন্তু তার রাজাকার বাহিনীও তখন বিশ্বাস করে উঠতে পারছিল না। কারণ, তারা পিছু হটতে শুরু করেছিল।  প্রতিটা গ্রামে-থানায় ততদিনে তারা আক্রান্ত হতে শুরু করেছিল।

বিজয়ের একবছর পর ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর পত্রিকাগুলোতে লেখা হয়— সেদিন অধিকৃত ঢাকা বেতারের আরেকটি ঘোষণা জনগণকে বেশ কৌতুক যুগিয়েছিল। বেতারে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছিল— বিমান আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিলে একধরনের সাইরেন বাজানো হবে— ‘অল ক্লিয়ার সাইরেন’। সেটা কীভাবে বাজবে এবং বিমান হামলার সময় জনগণকে কোন ধরনের আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, তা বলা হচ্ছিল। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো— এ ব্যাপারে যখন বেতারে ঘোষণা হচ্ছে, তখন ঢাকার আকাশে অলরেডি অপারেশন করছে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর বিমান। কিন্তু কোনও ধরনের সতর্কতা সাইরেন কেউ শুনতে পায়নি। অর্থাৎ এসব ছিল ফাঁকা বুলি।

এ দিন যুদ্ধ চলছিল সর্বত্র। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বেতার ভাষণে ভারতের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেন। এদিকে বাংলাদেশের সব রণক্ষেত্রে মুক্তিবাহিনী ও যৌথ বাহিনীর অগ্রযাত্রা অব্যাহত। মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনেও পূর্বের লক্ষ্য মতো এগিয়ে চলছিল। সবার লক্ষ্য তখন ঢাকা আক্রমণের। পুরো বিষয়গুলো ৩ ডিসেম্বরের পরে এমনই দ্রুত ঘটছিল যে, পাকবাহিনী সর্বত্র পিছু হটতে শুরু করে। পাকিস্তানি সমর নায়করা তখনও ঠিক বুঝতে পারেনি— ভারতীয় বাহিনী কোন পথে ঢাকার দিকে এগুচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এম এ হাসান বলেন, ‘ওই সময় পাক বাহিনী মনে করেছিল, তাদের ঘাঁটিগুলোই মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হবে। কিন্তু এমনটা ঘটতে দেখা যায়নি। কোন দিক দিয়ে ঢুকবে সেই আন্দাজ ও প্রস্তুতি তাদের ছিল না। ফলে নানাবার্তা দিয়ে ইয়াহিয়া শেষ সময়ে তার সৈন্যদের মনোবল জিইয়ে রাখতে চেয়েছেন।’

ঢাকার ভাটারা এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা এম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ঢাকায় শেলিং শুরু করলে সবাই নড়েচড়ে বসে। চার তারিখের মধ্যে মোটামোটি শতশত আক্রমণ হয়েছে। ঢাকার আকাশে বিমানযুদ্ধ চলছিল। একের পর এক জয়ের সংবাদ আসছিল। সীমান্ত শহরগুলোও তখন সম্মিলিত বাহিনীর দখলে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য ছিল— পাক বাহিনীকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া। যাতে তারা ঢাকা রক্ষার জন্য কোনও লড়াইয়ে নামতে না পারে। বাংলার মানুষ  তখন বুঝতে পারছিল তাদের জয় আসন্ন। বিমান হামলার সময় কোনও সাইরেন শুনেছেন কিনা, প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রশ্নই আসে না। তারা নিজেদের সামাল দিতেই পারছিল না, আমাদেরকে সতর্ক করবে তাদের সেই মেকানিজম তখন নেই। ৩ ডিসেম্বরের পর ঢাকার মানুষের চোখে-মুখে যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে, সেটাই ছিল প্রতিপক্ষের প্রতি বার্তা। এবং তারা সেই বার্তার অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পেরেছিল।’