মুক্তিযুদ্ধ যখন শেষ পর্যায়ে, আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি যখন শুরু হয়ে গেছে— তখন পাকিস্তান হানাদার বাহিনী যে জঘন্য কৌশল নিয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ঘৃণ্য বলে বিবেচিত। দেশের প্রতিটা সেক্টরের নক্ষত্র বাংলার বুদ্ধিজীবীদের ধরে এনে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। শত শত মানুষের লাশ গণকবর দেওয়ার সময়ও পায়নি পাকিস্তানি সৈন্য ও তাদের দোসরেরা। কত ভয়ঙ্করভাবে নির্যাতন করা যায়, তা তারা বাংলার মানুষকে দেখিয়ে দিয়ে মেধাশূন্য করার খেলায় মেতেছিল সেদিন।
এরপর কয়েক দশক চলে যায়। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হলে— বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড নিয়েও মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। অবশেষে ১১টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগে বিচার সম্পন্ন হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভোর ৩টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মাঈনুদ্দীনের নির্দেশে ৭-৮ জন সশস্ত্র আলবদর সদস্য সাংবাদিক সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে তার চামেলীবাগের বাড়ি থেকে অপহরণ করে। এরপর ইপিআরটিসির একটি মিনিবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। পরে তার মৃতদেহ আর পাওয়া যায়নি।
১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভোর ৪টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে ওই দুই বদর নেতার উপস্থিতিতে ৮-১০ জন সশস্ত্র আলবদর সদস্য পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনালের (পিপিআই) প্রধান প্রতিবেদক ও কলম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সার্ভিসের স্টাফ রিপোর্টার সৈয়দ নাজমুল হকের পুরানা পল্টনের বাসায় যায়। তারা জোর করে বাসায় ঢুকে বন্দুকের মুখে নাজমুলকে ইপিআরটিসির একটি মিনিবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে হত্যা করে। তার মৃতদেহও আর পাওয়া যায়নি।
১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর ভোর ৬টা থেকে সাড়ে ৬টার মধ্যে আশরাফুজ্জামান ও মাঈনুদ্দীনের নির্দেশে আলবদর সদস্যরা দৈনিক পূর্বদেশের প্রধান প্রতিবেদক এএনএম গোলাম মুস্তাফাকে তার গোপীবাগের বাসা থেকে বের করে একটি মিনিবাসে তোলে। পরে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যা করা হয়।
১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর ওই দুই জনের নির্দেশে আলবদর সদস্যরা পিপিআইয়ের মহাব্যবস্থাপক ও বিবিসির প্রতিবেদক নাজিম উদ্দিন আহমেদের কলতাবাজারের বাসায় যায়। তাকে সেখান থেকে আলবদর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং হত্যা করা হয়। তার মৃতদেহও আর পাওয়া যায়নি।
১৩ ডিসেম্বর আশরাফুজ্জামান ও মাঈনুদ্দীনের উপস্থিতিতে একদল সশস্ত্র আলবদর সদস্য দৈনিক শিলালিপির সম্পাদক সেলিনা পারভীনকে নিউ সার্কুলার রোডের বাসা থেকে বন্দুকের মুখে অপহরণ করে। একটি মিনিবাসে করে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যা করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৭ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়।
১৩ ডিসেম্বর সকাল ৮টা থেকে পৌনে ১০টার মধ্যে দুই আলবদর নেতার উপস্থিতিতে পাঁচ-ছয় জন সশস্ত্র সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ড. সিরাজুল হক খান, ড. মো. মর্তুজা, ড. আবুল খায়ের, ড. ফয়জুল মহিউদ্দিন, অধ্যাপক রাশিদুল হাসান, অধ্যাপক আনোয়ার পাশা ও ড. সন্তোষ ভট্টাচার্যকে তাদের বাসা থেকে বন্দুকের মুখে অপহরণ করে। একটি মিনিবাসে তুলে তাদের মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়।
১৬ ডিসেম্বরের পর মিরপুর বধ্যভূমি থেকে অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন, মর্তুজা, আবুল খায়ের, অধ্যাপক রাশিদুল, আনোয়ার পাশা ও সন্তোষ ভট্টাচার্যের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বাকি দুই জনের লাশ পাওয়া যায়নি।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর আশরাফুজ্জামান ও মাঈনুদ্দীনের উপস্থিতিতে সশস্ত্র আলবদর সদস্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায় বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর বাসায় ঢুকে পড়ে। এ সময় অধ্যাপক মোফাজ্জলের ভাই তখনকার বাংলা বিভাগের ছাত্র মাঈনুদ্দীনের মুখের কাপড় টেনে খুলে ফেললে তার পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যায়। এরপর অধ্যাপককে জোর করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যা করা হয়।
১৪ ডিসেম্বর দুপুরে আলবদরের ওই দুই নেতার নির্দেশে বাহিনীর সদস্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যকার মুনীর চৌধুরীকে তার সেন্ট্রাল রোডের বাসা থেকে বন্দুকের মুখে অপহরণ করে এবং অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে হত্যা করে। শহীদ এ বুদ্ধিজীবীর মৃতদেহ পরে পাওয়া যায়নি।
একই দিন সন্ধ্যা ৬টায় অভিযুক্ত দুই ব্যক্তির উপস্থিতিতে ৫-৬ জন সশস্ত্র আলবদর সদস্য দৈনিক সংবাদের যুগ্ম সম্পাদক শহীদুল্লাহ কায়সারকে কায়েতটুলীর বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। মিনিবাসে করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে তাকেও হত্যা করা হয়। শহীদুল্লাহ কায়সারের মৃতদেহও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
১৫ ডিসেম্বর দুপুরে আশরাফুজ্জামান ও মাঈনুদ্দীনের উপস্থিতিতে আলবদর সদস্যরা চিকিৎসক মো. ফজলে রাব্বিকে তার সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে বন্দুকের মুখে অপহরণ করে মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিক্ষা কলেজে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখান থেকে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর ১৮ ডিসেম্বর শহীদ এ চিকিৎসকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
১৫ ডিসেম্বর বিকালে সশস্ত্র আলবদর সদস্যরা দুই অভিযুক্তের নির্দেশে চিকিৎসক আলিম চৌধুরীর পুরানা পল্টনের বাড়িতে যায়। এরপর আলিম চৌধুরীকে বন্দুকের মুখে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে আলিমের চোখ বাঁধা লাশ পাওয়া যায়। তার স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী পরে জানতে পারেন, সেদিন আলবদর বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন চৌধুরী মাঈনুদ্দীন ও আশরাফুজ্জামান খান।
মামলাটি পরিচালনার বিষয়ে প্রসিকিউটর সাহেদুর রহমান বলেন, ‘মামলাটির কাজ করতে গিয়ে যখন বুদ্ধিজীবীদের সন্তান ও স্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলছিলাম, তখন বারবার মনে হয়েছে— এর অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করতেই হবে। কী ভয়ঙ্কর আর কী নৃশংস। পরিবারের সদস্যরা কী ভার বুকে বয়ে চলেছেন, তা অনুভব করা সম্ভব না। অবশেষে আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়েছি। কিন্তু মূল পরিকল্পনা ও হত্যাকারীরা দেশের বাইরে পলাতক থাকায় রায় কার্যকর সম্ভব হয়নি। নিশ্চয়ই একদিন সেটিও সম্ভব হবে।’