স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস

পত্রিকা ছিল প্রেসনোট আর মিথ্যাচারে ঠাসা




বিশ্ব ভালোবাসা দিবসের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে আরেকটি ঐতিহাসিক দিন ‘ স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’। ১৯৮৩ সালের এই দিনে (১৪ ফেব্রুয়ারি) স্বৈরাচার প্রতিরোধের ডাক দিয়ে মজিদ খানের অসম শিক্ষানীতি প্রতিহত করতে মিছিল বের করা হলে তাতে গুলি ছোড়ে পুলিশ।এ ঘটনায় নিহত হন জয়নাল, দিপালীসহ নাম না জানা আরও অনেকে। কিন্তু এতো বড় একটি ঘটনাকে সামরিক সরকারের মদদে গিলে ফেলে সে সময়ের জাতীয় দৈনিকগুলো।পরের দিনের প্রধান দৈনিকগুলোর পাতায় এ ঘটনা নিয়ে শীর্ষ সংবাদ (লিড স্টোরি) প্রকাশ করা হয় ঠিকই, কিন্তু সে খবরটা আসে সামরিক জান্তার পাঠানো প্রেস নোট থেকে। ফলে কমপক্ষে ১০ জন নিহত হলেও নিহতের সংখ্যা হয়ে যায় মাত্র একজন, আর ঘটনাটাকে উল্টে দিয়ে এর দায় চাপানো হয় ছাত্রদেরই ঘাড়ে।

দীর্ঘদিন পরে এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন সেসময়ের আন্দোলনকারী ও কর্মরত সাংবাদিকরা। বলছেন, সেসময় একেবারেই কিছু করার ছিল না, তা নয়। তবে সামরিক শাসনামলে এধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রেসনোট প্রকাশেই সম্পাদকরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন।

ইত্তেফাকসে সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা ও এরশাদ সরকারের হতে নির্যাতিত ডা. মুশতাক হোসেন মনে করেন, চাইলে তখন রুখে দাঁড়ানোর ভূমিকা নিতে পারতো পত্রিকাগুলো, ঠিক যেমন ছাত্ররা এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণের পরের দিনেই প্রতিরোধ করেছিল। মুশতাক বলেন,‘১৪ ফেব্রুয়ারি যে মিছিল বের হয় সেটি আসলে ১১ জানুয়ারি হওয়ার কথা ছিল, বিশেষ কারণে এটা পিছিয়ে দেওয়া হলে ওই সময়টাতে বারবার বেতারে ও টেলিভিশনে বলা হতো কী কী করা যাবে আর কী করলে গ্রেফতার করা হবে। ফলে আসল ঘটনা কী ঘটছে তা আমরা যারা উপস্থিত থাকতাম তাদের মুখে মুখে ছড়ানোর বাইরে আর তেমন কোনও উপায় ছিল না।’ তিনি বলেন,‘সামরিক শাসনের মধ্যে গণমাধ্যম পুরো স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না ঠিকই কিন্তু সেটা তো সেই অধীনতাটাকে মেনে নেওয়াই হলো। না মানলে কী হয় সেটা সবাই মিলে আমরা করে দেখাতে পারিনি।’

স্মৃতিকাতর মুশতাকের কণ্ঠে আক্ষেপ,‘চোখের সামনে এতোগুলো লাশ কিন্তু গণমাধ্যম বলেছে, একজন নিহত! আমাদের নেতাকর্মীদের আটক করে রাখা হয়েছে, কারা কোথায়, সে খবরও নেই। অথচ কেউ এসব সাংবাদিকতা দেখলে বুঝবে না, ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রাতে, তার পরের দিন কী ভয়াবহতা হয়েছিল। সে সময়ে পত্রিকায় এসব সংবেদনশীল বিষয় মিথ্যাচারে ঠাসা থাকতো।’

দ্য বাংলাদেশ অবজারভারের ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পত্রিকা১৯৮২ সালের ২৪ শে মার্চ লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পর পরই তাকে ছাত্রদের প্রতিরোধে মুখে পড়তে হয়েছে। একইসঙ্গে শুরু হয় ধরপাকড়। প্রথমদিনেই কলাভবনে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগাতে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে বিচারের ছুঁতোয় সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন ছাত্রনেতা শিবলি কাইয়ুম, হাবিবুর রহমান ও আব্দুল আলী।১৯৮২ সালের ১৭ ই সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবসে মজিদ খানের শিক্ষানীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলো ঐকমত্যে পৌঁছে। ১১ জানুয়ারির গণমিছিল পিছিয়ে ১৪ তারিখে নিয়ে যাওয়া হয় আর সেই সুযোগে সময় নিয়ে পরিকল্পনা করেই ছাত্রদের ওপর হামলা করে সামরিকজান্তা।

দ্য বাংলাদেশ অবজারভার, দ্য বাংলাদেশ টাইমস, ইত্তেফাক এবং দৈনিক বাংলার ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির পত্রিকার পাতা ওল্টালেই পরিষ্কার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনাটি সবাই লিড স্টোরি করলেও সেটা কেবল সরকার যেটুকু তথ্য সরবরাহ করেছিল সেটুকুই দেওয়া। এর বেশি কিছু নয়। যদিও নগরজুড়ে ১০ জনের নিহত হওয়ার খবর সংগঠনগুলো নিশ্চিত করতে পারে তারপরও সরকারি প্রেসনোটের হিসেবে একজন নিহত দিয়েই নিউজ প্রকাশ করা হয়।

সে সময়ের এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের (বর্তমানে প্রবাসী) কাছে পত্রিকাগুলোর ওই সময়ের ভূমিকার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পত্রিকারগুলো যা করেছে তার বাইরে কিছু করার সুযোগ নিশ্চয় ছিলো কিন্তু আহমেদ হুমায়ুন ও আনোয়ার জাহিদসহ যারা সাংবাদিক নেতা ছিলেন তারা বেঈমানি করেছিলেন। তারা বিএফইউজে ও ডিইউজের দায়িত্ব ছিলেন। ইউনিয়ন তাদের নিয়ন্ত্রণে। আমরা সাধারণ সাংবাদিকরা তৈরি ছিলাম কিন্তু নেতাদের নির্দেশ ভঙ্গ করার সাহস হয়নি আমাদের।

বিভিন্ন পত্রিকার প্রেসনোট১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারির ঘটনা নিয়ে পরের দিনের পত্রিকায় সরকারি প্রেসনোট ছাপানো হয়েছিল। তাই পত্রিকাগুলোর শিরোনাম ও সংবাদ ছিল প্রায় অভিন্ন। বেশিরভাগই শিরোনাম করে ‘ঢাবি বন্ধ, ১ জন নিহত’। এ বিষয়ে ওই সময়ে পত্রিকাগুলোর এর বাইরে আর কিছু করা সম্ভব ছিল কিনা এমন প্রশ্ন করা হয় তদানীন্তন সংবাদ পত্রিকার সাংবাদিক ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক আলী রিয়াজকে। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রত্যাশার বিবেচনায় বলতে হবে পারা উচিত ছিলো। সেই আন্দোলনের একজন কর্মী হিসেবে আমার প্রত্যাশা ছিলো যে এত বড় একটা ঘটনা এর চেয়ে বেশি কভারেজ দাবি করে। কিন্তু সামরিক শাসনের কঠোর সেন্সরশিপের মধ্যে এর চেয়ে বেশি কিছু সম্ভব ছিলো বলে আমার মনে হয় না। আমি তখন দৈনিক সংবাদে কর্মরত সাংবাদিকও। ফলে আমি তার আগেই দেখেছি যে কতটা চাপের মুখে সংবাদপত্রকে কাজ করতে হচ্ছে। সম্ভবত এই আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর অনুপস্থিতিও একটা কারণ। যদি রাজনৈতিক দলগুলো আরও প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন জানাতো, অংশ নিতো, তাঁদের দোদুল্যমানতা না থাকতো তা হলে সংবাদপত্রগুলো ঝুঁকি নেওয়ার কথা ভাবতে পারতো।’

১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩, দৈনিক বাংলার চিত্রগণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক কাবেরী গায়েন সামরিক শাসনামলের সাংবাদিকতা বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'এই আলোচনাটা খুব জরুরি। নতুন করে ওয়ান ইলেভেনের সময় সাংবাদিকতার সূত্র বিষয়ে মাহফুজ আনামের স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে এই বিষয়ের আলোচনাটা আবার সামনে এসেছে, সেটা সুস্থভাবে শুরু করা দরকার। সামরিক আমলে আমরা সাংবাদিকতার নামে ডিজিএফআই-এর দেওয়া চোথাকেই মূলত ব্যবহৃত হতে দেখেছি সবসময়। বিশেষত, এই জাতীয় ঘটনায়।'
পত্রিকা কৃতজ্ঞতা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্রাটেজি ফোরাম।

/টিএন/