আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি। বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের শততম জন্মবার্ষিকী। মৃত্যুর ৫ বছর পরও তার স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের সরকারি-বেসরকারি কোনও উদ্যোগ না নেওয়ায় শিল্পীর পরিবার তার বসতঘরকে জাদুঘর হিসেবে ব্যবহার করছেন। তার ব্যবহৃত বাদ্যযন্ত্র, স্মারক, সনদ, সাধনা সামগ্রী দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে বাউল অনুরাগীরা প্রতিদিন ভিড় করেন। তবে সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হতে চলছে তার স্মৃতিচিহ্ন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন জানান, এক প্রভাবশালী রাজনীতিবিদের অনাগ্রহের জন্য বাউল সম্রাটের স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামের কৃষক ইব্রাহিম আলী আর নাইওরজান বিবির ঘরে ১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জন্ম গ্রহণ করেন এই কিংবদন্তী শিল্পী। বিষয় সম্পত্তির প্রতি তার কোনও মোহ ছিল না। তাই তো তিনি মাটি ও মানুষের গানের স্রষ্টা ।
পুঁথিগত বিদ্যার পাঠশালা নয়, তার শিক্ষা হয়েছে প্রকৃতির পাঠশালায়। জীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয় গোচারণ ভূমিতে। শৈশবে অক্ষর জ্ঞানহীন থাকলেও তার তৃতীয় নয়নের লব্ধ জ্ঞানকে কাগজে রূপ দিতে তিনি ভর্তি হন নাইট স্কুলে। সতীর্থদের নিয়ে গাজীর গান, বাউলা গান, ঘাটু গান, পালাগান, সারিগান, মালজোড় গান, কবিগানসহ বিভিন্ন অতি প্রাকৃতজনের গান পরিবেশেন করতেন। শাহ আব্দুল করিমের রচিত বাউল, মুর্শিদী, জারিসারি, ভাটিয়ালি প্রভৃতি গান লোকমুখে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। মাত্র ২০ বছর বয়সে ‘আফতাব সংগীত’ নামে তার প্রথম গানের বই প্রকাশিত হয়। আফতাব সঙ্গীত, গণসঙ্গীত, ভাটির চিঠি, ধলমেলা, কালনীর ঢেউ ও কালনীর কূলেসহ স্বরচিত গানের গীতিকথা নিয়ে তার ৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে।
দেশে-বিদেশে সাড়ম্বরভাবে এই শিল্পীর জন্মবাষির্কী পালিত হলেও অবহেলিত রয়েছে তার পৈতৃক ভিটা। বরাম হাওরের সাবমার্জিবল সড়ক দিয়ে শাহ আব্দুল করিমের বাড়ি যাওয়ার সড়কে হাঁটতে গিয়ে বারবার হোঁচট খান দর্শনার্থীরা। চরমভাবে অবহেলার স্বীকার এ গুণী শিল্পীর বসত বাড়ি, সমাধিসহ অন্যান্য স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা। তার স্মরণে দিরা ইবা উজানধলের কোথাও একটি তোরণ পর্যন্ত নেই। এভাবে চলতে থাকলে বাউলের অনেক স্মৃতিচিহ্ন হারিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তার ভক্তরা। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও ভক্তদের জন্য হলেও তার স্মৃতি সংরক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
বাউল শিল্পী জুঁই ঠাকুর বলেন, ‘নুতন প্রজন্মের কাছে বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমকে তুলে ধরতে হলে তার স্মৃতি ও স্থাপনা সংরক্ষণ করতে হবে। নুতন প্রজন্ম শাহ আবদুল করিমের সম্মাননা, পদক, মেডেলসহ অন্যান্য স্মৃতি দেখে বাস্তব জ্ঞান লাভ করতে পারবে।’
যশোর থেকে আসা দর্শনার্থী বেলায়েত আহমদ বলেন, ‘আমি বাউল সম্রাটের শততম জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে তার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলাম। এখানে আসার পর যা দেখলাম তা খুবই দুঃখজনক। তার বিভিন্ন সম্মাননা ও পদক কাঠের শোকেজে গাদাগাদি করে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। স্বল্প আলোর জন্য ভালো করে দেখাও যায় না।’
শাহ আব্দুল করিমের পুত্রবধূ বলেন, ‘আমার শ্বশুরের শততম জন্মবার্ষিকী সরকারিভাবে পালন করা হচ্ছে এতে আমরা খুশি। কিন্তু তার স্মৃতি, সম্মাননা, পদক ও বাদ্যযন্ত্র সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করার আমাদের কোনও জায়গা নেই। অনেক দর্শনার্থী শাহ আব্দুল করিমের বসতঘর, সমাধি ও বিভিন্ন সম্মননা পদক এভাবে পড়ে থাকতে দেখে দুঃখ প্রকাশ করেন। আমার শ্বশুর বলতেন, কুঁড়ে ঘরে থাকা ভালো। কিন্তু বাঁচার মতো বাঁচতে হবে।’
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন বলেন, বাউল আব্দুল করিম পরিষদ নামে একটি সংগঠন রয়েছে। এ সংগঠনটির দাবি ছিল, শাহ আব্দুল করিমের স্মৃতি রক্ষার জন্য একটি জাদুঘর নির্মাণ করার। এজন্য দিরাই উপজেলা প্রশাসন জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে জাদুঘর ও দর্শনার্থীদের জন্য বিশ্রামগার নির্মাণের একটি প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অচিরেই বিশ্রামাগার ও জাদুঘর নির্মাণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশঅ প্রকাশ করেন।
/এসটি/