৪৬ বছরে স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন ২৯ নারী

স্বাধীনতার ছয় বছর পর ১৯৭৭ সাল থেকে সর্বশেষ ২০২২ সাল পর্যন্ত ৪৬ বছরে মোট ২৯ জন নারী দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পদক’ পেয়েছেন। এর মধ্যে সস্কৃতিতে ৭, সমাজসেবায় ৭, সাহিত্যে ৫, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে ৫, চিকিৎসা বিজ্ঞানে ১, জনসেবায় ১, ক্রীড়া ও খেলাধুলায় ১, পল্লী উন্নয়নে ১ এবং গবেষণায় ১ জন নারী। 

জানা গেছে, ১৯৭৭ সালে প্রবর্তিত স্বাধীনতা পদক এ পর্যন্ত (২০২২ সাল পর্যন্ত) পেয়েছেন ৩০০ জন ব্যক্তি এবং ২৯টি প্রতিষ্ঠান। তবে এর মধ্যে একজন অনাগ্রহ প্রকাশ করে এই পদক গ্রহণ করেননি। এছাড়া একাধিক ব্যক্তির পদক বিভিন্ন কারণে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। সব কিছু বাদ দিয়ে এ পর্যন্ত স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন এই ২৯ গুণী নারী।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক যেসব নারী পেয়েছেন তারা হলেন-১৯৭৭ সালে সংস্কৃতি ক্যাটাগরিতে (সংগীত) রুনা লায়লা, ১৯৭৯ সালে সংগীতে ফিরোজা বেগম, ১৯৮১ সালে সমাজসেবায় তাহেরা কবির ও সামসুন নাহার মাহমুদ, ১৯৮২ সালে সমাজসেবায় ফিরোজা বারী, ১৯৯৩ সালে পল্লী উন্নয়নে জাহানারা বেগম, ১৯৯৫ সালে সংগীতে ফেরদৌসী রহমান ও সমাজসেবায় সৈয়দা ইকবাল মাহমুদ মান্দ বানু, ১৯৯৬ সালে সংগীতে সাবিনা ইয়াসমিন, ১৯৯৭ সালে সমাজসেবা ও সাহিত্যে যথাক্রমে জাহানারা ইমাম এবং কবি সুফিয়া কামাল।

সূত্র জানিয়েছে, ১৯৯৮ সালে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, ১৯৯৯ সালে সমাজসেবায় এই পদক পেয়েছেন বেগম বদরুন্নেছা আহমদ, ২০০০ সালে ক্রীড়া ও খেলাধুলায় শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল খুকী, ২০০১ সালে সাহিত্যে সৈয়দা মোতাহেরা বানু, ২০০৪ সালে জনসেবায় মিস ভেলেরি এ টেইলর, ২০০৯ সালে সমাজসেবায় আইভি রহমান, ২০১০ সালে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে বেগম সাজেদা চৌধুরী, সাহিত্যে রোমেনা আফাজ এবং সংস্কৃতিতে (ভাস্কর্য) পদকটি পেয়েছেন ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র আরও জানায়, ২০১১ সালে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ ক্যাটাগরিতে স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন নীলিমা ইব্রাহিম, ২০১২ সালে একই ক্যাটাগরিতে ডা. সৈয়দা বদরুন নাহার চৌধুরী, ২০১৬ সালে সংগীতে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে সাহিত্যে রাবেয়া খাতুন এবং সেলিনা হোসেন। ২০১৯ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতায় কাজী মেজবাহুন নাহার, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ক্যাটাগরিতে হাসিনা খান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানে স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন নুরুন নাহার ফাতেমা বেগম। ২০২০ সালে সংস্কৃতিতে (অভিনয়) পুরস্কারটি পেয়েছেন ফেরদৌসী মজুমদার। তবে ২০২১ এবং ২০২২ সালে কোনও নারী স্বাধীনতা পুরস্কার পাননি। ২০২৩ সালের পদকপ্রাপ্তদের নাম এখনও পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়নি।           

জানা গেছে, স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার বা স্বাধীনতা পুরস্কার বা স্বাধীনতা পদক বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহিদদের স্মরণে ১৯৭৭ সাল থেকে প্রতি বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসে (২৬ মার্চ) এই পদক প্রদান হয়ে আসছে। জাতীয় জীবনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৌরবোজ্জ্বল ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের নাগরিক এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এই পুরস্কার প্রদান করে সরকার। ব্যক্তির পাশাপাশি জাতীয় জীবনের নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অনন্য উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠানসমূহকেও এই পুরস্কার প্রদান করা হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, প্রত্যেক পদকপ্রাপ্তদের একটি ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ নির্মিত ৫০ গ্রাম ওজনের পদক, একটি সম্মাননাসূচক প্রত্যয়নপত্র এবং সম্মাননা স্বরূপ নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। প্রাথমিকভাবে প্রদানকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার টাকা। ২০১৩ সাল থেকে ২ লাখ টাকা করে প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে এটি ২০১৭ সালের মে মাসে ৩ লাখ এবং ২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়।

সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে স্বাধীনতা পদকের প্রবর্তন করেন। স্বাধীনতা পদক প্রদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার নির্ধারিত কিছু বিষয়ের প্রতি নজর দেয়। এগুলো হলো-স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিদ্যা, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, পল্লী উন্নয়ন, সমাজসেবা/জনসেবা, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জনপ্রশাসন এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণ।

জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকারের সকল মন্ত্রণালয়/ বিভাগ, জেলা প্রশাসক, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে অধিদফতর/ দফতর/ সংস্থাকে পুরস্কার প্রদানের বিষয় উল্লেখ করে সংযুক্তি ছক অনুযায়ী তাদের কাছ থেকে প্রস্তাব আহ্বান করা হয়। এই পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিদের নামের প্রস্তাব বা মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে সকল ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এছাড়া তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী মন্ত্রী ও সচিবরা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম পাঠানোর পর প্রাথমিক বাছাই করে একটি তালিকা করা হয়। এরপর পদক কমিটির বৈঠকে এই তালিকা উঠানো হয়। সেখান থেকে তালিকা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী এই তালিকায় সংযোজন বা বিয়োজন করতে পারেন। এরপর মন্ত্রিসভার বৈঠকে তালিকাটি চূড়ান্ত করা হয়। পুরস্কারপ্রাপ্তদের সংখ্যা কোনও বছর ১০ এর বেশি হবে না, তবে প্রধানমন্ত্রী চাইলে এই সংখ্যা বাড়াতে পারেন বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

আরও জানা গেছে, কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পদক গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মতামত মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জানাতে হয়। ফলে ঐ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম পদক প্রাপ্তদের চূড়ান্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় না। এবং তাদের নাম পদকপ্রাপ্ত হিসেবে ঘোষণাও করা হয় না। পদকটি সাধারণত স্বাধীনতা দিবসের সন্ধ্যায় বা প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সময়সূচি অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রিপরিষদ সদস্য ও অন্যান্য বিশিষ্ট নাগরিকদের উপস্থিতিতে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রদান করা হয়।