সেদিন ভুট্টোর তারবার্তা পূর্ব বাংলার আন্দোলনে কোনও প্রভাব ফেলেনি

১১ মার্চ, ১৯৭১। এদিন অবস্থা বেগতিক দেখে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তারবার্তা পাঠান। কী ছিল সেই বার্তায়? ওই তারবার্তায় গত কয়েক দিনের নিপীড়ন-নির্যাতনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং সমঝোতার প্রস্তাব দেন। এদিকে ভুট্টোর তারবার্তাকে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী জনগণ কূটকৌশল ও সময়ক্ষেপণ হিসেবে উল্লেখ করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্রের তথ্যানুযায়ী, ১৯৭২ সালের সংবাদপত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে পাঠানো তারবার্তায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) প্রধান জুলফিকার আলী ভু্ট্টো বলেন, ‘পাকিস্তানকে রক্ষা করা আমাদের সাধারণ লক্ষ্য হওয়া উচিত। দেশের উভয় অংশ যাতে সব সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার গ্রহণ করে শান্তি ও অগ্রগতির পথে পরিচালিত হতে পারে, সে জন্য আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিত।’

কিন্তু পূর্ব বাংলার স্বাধীনতাকামী জনগণ সতর্ক করে দেন—পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে যেন কোনও প্রকার সমঝোতায় না যান বঙ্গবন্ধু। তাদের বিশ্লেষণ বলে, মূলত ৭ মার্চের ভাষণের পরের পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা থেকেই এই তারবার্তা।

এক বিবৃতিতে কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতারা বলেন, আমরা জানতে পারলাম যে বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাক্ষাৎ করবেন। এই সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানের পূর্বে আমরা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে তার ৬ মার্চের ভাষণ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। একমাত্র এই বক্তৃতা প্রত্যাহারের পরই সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠান হতে পারে বলে আমরা মনে করি। একইসঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে বঙ্গবন্ধুর বাসগৃহে গিয়ে সাক্ষাৎ করতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দেন ছাত্রনেতারা। পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুকে তারা আহ্বান জানান, প্রেসিডেন্ট হাউজে না যাওয়ার।

তিনি যেটাই উচিত ভাবুন না কেন পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ীরা ইয়াহিয়ার প্রতি বার্তা পাঠান, অবিলম্বে প্রতিকার না করা গেলে পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এদিকে, নিউজপ্রিন্টের অভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদপত্রের কলেবর হ্রাস করা হয়। করাচির ডনসহ পশ্চিম পাকিস্তানের পত্রিকাগুলোর কলেবর ১৪ পৃষ্ঠার পরিবর্তে মাত্র ৪ পৃষ্ঠা ছাপা হয়েছে। এসব পত্রিকা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের কাগজ ব্যবহার করে।  ১ মার্চ থেকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে কাগজের চালান বন্ধ করা হয়েছে।

১৯৭২ সালের ১২ মার্চে প্রকাশিত পত্রিকায় আগের দিনের ঘটনাগুলোর বর্ণনা ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হয়। খবরে বলা হয়, গত ৭ মার্চ আওয়ামী লীগ প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে শান্তিপূর্ণ অসহযোগ আন্দোলনের আহ্বান জানান। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরসহ চার দফা দাবি পেশ করে—তা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে বলে তিনি ঘোষণা করেন। আন্দোলনের আওতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনও অফিসের একজন কর্মচারীও কাজে যোগ দেননি। এদিকে সব বাড়িঘর, দোকানপাট অফিস-আদালতে কালো পতাকা উড়ানো অব্যাহত ছিল। জনসাধারণও কালোব্যাজ ধারণ করে।

এছাড়া ৩২ হাজার টন গমভর্তি জাহাজ ভিনটেজ হরিজন ১৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা থাকলেও গতিপথ পরিবর্তন করে করাচি অভিমুখে যাত্রা করে। যদিও এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘বন্দর কর্তৃপক্ষ সব কাজ চালিয়ে যাবেন। বহিরাগত ও বহির্গমন জাহাজের চলাচলে বন্দর কর্তৃপক্ষের অফিসের যে অংশ অতি প্রয়োজনীয়, তা অবশ্যই সুষ্ঠুভাবে চালু থাকবে। তবে জনগণকে পীড়ন করার উদ্দেশ্যে যাকিছু আনা হবে, তা খালাসের ব্যাপারে পূর্ণ অসহযোগিতা দেখাতে হবে।’