জাতীয় সংসদে জনগণের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে আলোচনার আহ্বান এমপিদের

জাতীয় সংসদের  সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে সংসদের বিশেষ অধিবেশনের বিশেষ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা বলেছেন, জাতীয় সংসদের মান ক্রমাগতভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সংসদের চরিত্র পাল্টে যাচ্ছে। সংসদকে সত্যিকার অর্থে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করতে হলে এখানে জনগণের দুঃখ, কষ্ট নিয়ে আলোচনা করতে হবে।

শুক্রবার (৭ এপ্রিল) সুবর্ণজয়ন্তীতে সাধারণ আলোচনার জন্য একটি প্রস্তাব তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই প্রস্তাবের ওপর সংসদ সদস্যরা আালোচনায় অংশ নিচ্ছেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমরা এমন একটি সংসদ তৈরি করবো যা অন্যের জন্য শিক্ষার বিষয় হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতায় দেখছি, আমাদের পার্লামেন্টের যে মান তা ক্রমাগতভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।’

জাতীয় সংসদ নিয়ে একটি গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘ওই গবেষণায় দেখা যায়, সংসদে এক ঘণ্টার বক্তৃতায় মানুষের কথা হয় তিন মিনিট। বাকি সময় নিজের, দলের, দলের নেতার বিষয়ে কথা হয়। রাষ্ট্রপতিও তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, সামনে হয়তো আইনের পরিবীক্ষণ, মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের জন্য বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের সংসদের চরিত্র ক্রমাগত পাল্টে যাচ্ছে। রাজনীতির বাণিজ্যায়ন, নির্বাচনের বাণিজ্যায়নের ফলে সংসদের নতুন চেহারা দাঁড়িয়েছে।’

ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি বলেন, এখন সংসদে ব্যবসায়ীর সংখ্যা অনেক বেশি। রাজনীতি করলে ব্যবসা করা যাবে না এমন নয়। কিন্তু ব্যবসায়ীর সংখ্যা বেশি হয়ে গেলে স্বার্থের বিষয় চলে আসে। তিনি বলেন, সংবিধান পর্যালোচনা ও সংসদের নানা বিষয়ে সংস্কার করা প্রয়োজন।

সংবিধানের চার মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো বিলোপ, ক্ষদ্র নৃগোষ্ঠী নিয়ে জাতিগত বিভ্রান্তি দূর করা এবং ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সংসদ সদস্যদের ক্ষমতায়নে সংবিধান পর্যালোচনায় সংসদীয় কমিটি গঠনের দাবি জানান জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু। নিজের বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করার পাশাপাশি বিএনপির কঠোর সমালোচনা করেন ১৪ দলীয় জোটের শরিক ইনু।

তিনি বলেন, নষ্ট রাজনীতির ধারক-বাহক বিএনপি ও জামায়াত তথাকথিত ২৭ দফা ও ১০ দফা দিয়ে সংবিধান খোলনলচে বদলে দেওয়ার হুংকার ছেড়েছে। সংবিধানটাকে বাতিল করার কথা বলছে।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, জাতীয় সংসদকে সত্যিকার অর্থে সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করতে চাইলে সংসদে মানুষের দুঃখ, কষ্ট নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এই আলোচনা না হলে মুখে বললেও সংসদ সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হবে না। না হলে সংসদের বাইরের যে আলোচনা সেটাই হবে কেন্দ্রবিন্দু, পত্রিকার কথাবার্তাই প্রাধান্য পাবে।

জাতীয় পার্টির এই সংসদ সদস্য বলেন, সবাই মিলে জনগণের কথা বলতে হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কোনও বাধা নয়। সরকারি দলের সদস্যরা সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারবে না, এমন নয়। সংসদকে কেন্দ্রবিন্দু করতে হলে সব সংসদ সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। দলের প্রতি আনুগত্য থাকবে। কিন্তু জনগণ ও রাষ্ট্র দলের চেয়ে বড়। তিনি সংসদীয় কমিটিগুলোকে আরও কার্যকর করার পরামর্শ দেন।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, এই ৫০ বছরে শত শত, হাজার হাজার আইন পাস হয়েছে। অনেক মহান আইন পাস হয়েছে। আবার দায়মুক্তি অধ্যাদেশের মতো কালো আইনও পাস হয়েছে। আমরা সরকারকে কতটুকু দায়বদ্ধ করতে পেরেছি সেই মূল্যায়ন প্রয়োজন। আমরা সরকারকে কতটুকু বাধ্য করতে পারি তার বেঠিক সিদ্ধান্ত থেকে সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে?

তিনি বলেন, সংসদের ধারণাই হচ্ছে যারা দেশ চালাবে তাদের ভুলগুলো বিরোধী দল ধরিয়ে দেবে। পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করবে।

নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংসদ কাঠামোগতভাবে সরকারকে পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করতে পারে না। এর কারণ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন। এছাড়া প্রশ্নোত্তর পর্ব আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসদীয় কমিটিগুলো নিয়মিত বসছে না। কমিটির বেশিরভাগ সভাপতি সরকারি দলের হওয়ায় এখানে সিজার টু সিজার আপিল হয়ে যায়। মন্ত্রী, সভাপতি একই দলের। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো সংসদীয় কমিটিগুলো কাজ করতে পারছে না।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, এর কারণে আমরা মনে করি সারা বাংলাদেশের বাকস্বাধীনতা আছে। কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় সংসদে এমপিদের বাকস্বাধীনতা নাই। সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অ্যামেন্ডমেন্ট, বাজেটের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারা কিছু বাদ দিলে বাকি সব বিষয়ে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ ওপেন করে দেওয়া উচিত।

শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বাজেটের ১ শতাংশ পরিবর্তন করা যায় না। এখন সময় এসেছে সেই সংসদ তৈরি করার যেটা পরিবর্তন আনতে পারবে, আইনের পরিবর্তন আনতে পারবে। যে সংসদ বাজেটে পরিবর্তন আনতে পারবে। যে সংসদ বিরোধী দলের ‘ভয়েজ’ সংখ্যা দিয়ে বিচার করবে না, যৌক্তিতায় বিচার করা হবে।

রাজনীতিতে বহিরাগতদের গুরুত্ব বেড়ে গেছে মন্তব্য করে জাতীয় পার্টির এই সংসদ সদস্য বলেন, যারা রাজনীতি করছেন না, কিন্তু হঠাৎ করে সংসদ সদস্য হয়ে যাচ্ছেন। একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসছেন না। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র না থাকলে জাতীয় সংসদে কখনও গণতন্ত্র চর্চা আসবে না।

সরকারি দলের এমপি তানভীর শাকিল বলেন, আজ আমরা দেখি দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়। আজ আমাদের মহান স্বাধীনতা, স্বাধীনতা যুদ্ধকে অপমান করা হয়। আজ স্বাধীনতা দিবসকে অপমান করে বিকৃতভাবে চাইল্ড এক্সপ্লোয়টেশনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়। আমি সে সব সুশীল বাবুদের এবং তাদের পত্রিকার কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, যখন ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল তখন স্বাধীনতার চেতনা কোথায় ছিল? যখন ২১ আগস্টে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়েছিল তখন স্বাধীনতা কোথায় ছিল? যখন বাংলাদেশে সারের জন্য কৃষকদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, যখন বিদ্যুতের জন্য সাধারণ মানুষকে গুলি করা হয়েছিল তখন স্বাধীনতা কোথায় ছিল? তখন তো আপনাদের বোধোদয় হয় নাই। তখনতো আপনারা স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন নাই। এখন আপনারা স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেন। কারণ জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। শতভাগ বিদ্যুতায়নের বাংলাদেশ। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলের বাংলাদেশ, উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। তাই আপনাদের গায়ে জ্বালা ধরে। ওই সুশীল বাবু, কুশীল বাবু আর নরসুন্দর বাবুদের দিয়ে দেশে গণতন্ত্র আসবে না।

সরকারি দলের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচন খুব গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন ঘিরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত হচ্ছে। তিনি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ব্যক্তিগতভাবে বলেছেন। ভেদাভেদ ভুলে আবার নৌকাকে বিজয়ী করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কির একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরে সরকারি দলের সংসদ সদস্য শাজাহান খান বলেন, হ্যারল্ড লাস্কি বলেছেন, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা কথাটা আপেক্ষিক। কোনও দেশের সমাজ কতটা স্বাধীনতা ভোগ করবে তা নির্ভর করবে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর। যে দেশ যতটা শিক্ষিত, নাগরিক অধিকার সচেতন, অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নত সেখানে বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ততটা উন্নত। শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা এবং আর্থিক ব্যবস্থায় অনগ্রসর দেশে ততটা বাকস্বাধীনতা আশা করা অন্যায়। এই স্বাধীনতা অনগ্রসর দেশে দেওয়া হলে তা হবে শিশুর হাতে খুন্তি তুলে দেওয়ার মতো।

আলোচনায় আরও অংশ নেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, আব্দুস শহীদ, মোসলেম উদ্দিম, রাজ উদ্দিন রাজু, ইমাজউদ্দিন প্রামাণিক, সৈয়দা জাকিয়া নূর, সিমিন হোসেন রিমি, নাহিম রাজ্জাক, হাবিবা রহমান খান, সাইফুজ্জামান শিখর, বিরোধী দলের দলের চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা, রওশন আরা মান্নান প্রমুখ।