পশ্চিমা বিশ্বের ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামো

ঢাকার আরও বেশি ভূমিকা রাখার বিষয়ে টোকিওর সঙ্গে ঐকমত্য

কানেক্টিভিটি-কেন্দ্রিক উন্নয়নকে মাথায় রেখে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী বাংলাদেশ ও জাপান। এজন্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কৌশলগত স্তরে নিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী। এর পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোতে বাংলাদেশের আরও বেশি ভূমিকা রাখার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে দুই দেশ। এর ফলে পশ্চিমা বিশ্বের ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বৃহৎ পরিকল্পনায় বড় আকারে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হলো।

বুধবার (২৬ এপ্রিল) টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদার মধ্যে শীর্ষ বৈঠকের পরে ঘোষিত যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টি জোরালোভাবে ফুটে উঠেছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী কিশিদার আমন্ত্রণে টোকিও সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী হাসিনা। এই সফরে দুই দেশের মধ্যে ৮টি চুক্তি ও সহযোগিতা স্মারক সই হয়েছে।

৯ পৃষ্ঠার যৌথ বিবৃতিতে প্রথমে যে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেটি হচ্ছে— আঞ্চলিক ও অন্যান্য অঞ্চলে ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর অধীনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা।

দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিন-পণর্ব এশিয়ার সংযোগ স্থলে অবস্থিত বাংলাদেশের গুরুত্বকে স্বীকার করে নিয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, অবকাঠামোর উন্নতি হলে এ অঞ্চলে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি পাবে— যা বাংলাদেশ ও এ অঞ্চলের উন্নয়নে সহায়ক হবে।

এছাড়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বেসরকারি খাতকে সহযোগিতা করার জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল আপগ্রেডেশন, কৃষি খাতে সহযোগিতা এবং সাইবার সিকিউরিটি ও আইসিটি উন্নয়ন বিষয়গুলোও যৌথ বিবৃতিতে উঠে এসেছে।

আঞ্চলিক সহযোগিতা ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদীর মধ্যে যে বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে সেগুলো হচ্ছে— উত্তর কোরিয়া, অবাধ ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক এবং রোহিঙ্গা সমস্যা।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে ইউক্রেনের অখণ্ডতা রক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংলাপের গুরুত্ব আরোপ করে বিবৃতিতে ইউক্রেনের মানুষের প্রতি সমর্থন অব্যহত রাখার বিষয়টি বলা হয়েছে।

ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে ঐকমত্য

জাপান সফরের একদিন আগে বাংলাদেশ তার ইন্দো-প্যাসিফিক আউটলুক ঘোষণা করে। ওই আউটলুকের সঙ্গে জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজির অনেক মিল আছে। ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লেখা এক চিঠিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ করেন। এরপর ২০২২ সালে ফ্রান্স সফরের সময়ে যৌথ বিবৃতিতে বিষয়টি আবারও উল্লেখ করা হয়।

জাপান সফরে ঘোষিত যৌথ বিবৃতিতে প্রথম যে সহযোগিতাটি উল্লেখ করা হয় সেটি হচ্ছে, ইন্দো-প্যাসিফিক কাঠামোর অধীনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টি।

অবাধ ও মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিকের জন্য বিবৃতিতে দুই পক্ষ একমত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা ও জাহাজ বা উড়োজাহাজ চলাচলে সবার অধিকার আছে, এ বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।

কৌশলগত সম্পর্ক

ভারত ও চীনের পর জাপানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক তৈরি করলো বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে একটি বড় ঘটনা এবং এটির আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাব রয়েছে।

এই কৌশলগত সম্পর্ক বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ অর্জনে সহায়ক হবে এবং জাপানের বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে বাংলাদেশকে। এর পাশাপাশি চীন, ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি সহায়ক হবে।

প্রতিরক্ষা সহযোগিতা

গত বছর জাপান তাদের ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি ঘোষণা করে এবং তাদের প্রতিরক্ষা ব্যয় অনেকগুণ বৃদ্ধি করেছে। ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজির একটি উপাদান হচ্ছে— এ অঞ্চলের সমমনা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশের বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দায়িত্বশীল ব্যবহার দেশটির প্রতি আগ্রহী করে তুলেছে জাপানকে।

এই স্মারকের উদ্দেশ্য হচ্ছে— দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সংলাপ জোরদার করা। এছাড়া দুই দেশের কর্মকর্তাদের সফর, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, সেমিনার আয়োজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দুই পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে অন্যান্য যেকোনও বিষয় নিয়ে সহযোগিতা। যৌথ বিবৃতিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে— দুই দেশের দূতাবাসে প্রতিরক্ষা উইং খোলা হবে।

‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ এর মধ্যে বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীকে আধুনিক করার উদ্যোগের বিষয়ে জাপানকে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এছাড়া প্রতিরক্ষা সামগ্রী ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিষয়ে একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করার বিষয়টিকেও স্বাগত জানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা শব্দটি নেই

পৃথিবীর অনেক দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এবং প্রকাশ্যে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করে না। এবারে যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমার পরিস্থিতি এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে বক্তব্য থাকলেও ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত মানুষ’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

বিবৃতিতে দুই প্যারায় মিয়ানমার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশে করে উল্লেখ করা হয় যে, আসিয়ানের পাঁচ দফা বাস্তবায়নের প্রতি দুই দেশ পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে। এছাড়া ওই দেশে যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের মুক্তি ও গণতন্ত্রের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

দুই প্রধানমন্ত্রী একমত পোষণ করে যে, রোহিঙ্গা সমস্যা দীর্ঘায়িত হলে গোটা অঞ্চল ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং এর সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত যাওয়া।

কানেক্টিভিটি

২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টোকিও সফরের সময়ে জাপানের ইন্দো-প্যাসিফিক ভিশন ‘বিগ-বি ইনিশিয়েটিভে’ যুক্ত হয় বাংলাদেশ। ওই সময় থেকে মাতারবাড়িকে আঞ্চলিক ‘কানেক্টিভিটি হাব’ হিসেবে বিবেচনা করে দক্ষিণ চিটাগাংকে নতুনভাবে গড়ে তোলায় সহায়তা করছে জাপান। 

এনার্জি ও লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি মাতারবাড়িতে রোড, রেল ও মেরিটাইম কানেক্টিভিটি বৃদ্ধির জন্য বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়েছে জাপান। এজন্য ২০০০ কোটি ডলারের বৃহৎ মহেশখালী-মাতারবাড়ি ইন্টিগ্রেটেড  ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ নিয়ে কাজ করছে দুই দেশের সরকার। এটি সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার জন্য জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে যৌথ বিবৃতিতে।