হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংস্থাগুলো একবাক্যে বলছে, মাহফুজ আনাম বা কানহাইয়া কুমার দুজনেই তাদের নিজ-নিজ দেশে স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের শিকার। আর দক্ষিণ এশিয়াতে মান্ধাতার আমলের সেই অগণতান্ত্রিক আইন বিলোপ করার দাবিতেই এক সূত্রে বাঁধা পড়েছেন ঢাকার দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক এবং দিল্লির জহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট। পঁয়ষট্টি বছরের প্রবীণ এক সাংবাদিক ও আঠাশ বছরের তরুণ এক ছাত্র নেতা নিজেদের অজান্তেই তাদের নিজেদের দেশে এক জরুরি বিতর্কের সূচনা করেছেন।
কানহাইয়া কুমারকে নিয়ে নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের বিবৃতি দিয়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারি। তার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরদিন এসেছে তাদের দ্বিতীয় বিবৃতিটি। যা মাহফুজ আনাম ও প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানকে নিয়ে। দুটো বিবৃতির ভাষা, ভঙ্গি ও বক্তব্যে এতটাই মিল যে, প্রায় চমকে উঠতে হয়। এর আগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও ১৭ ফেব্রুয়ারি কানহাইয়া কুমারের গ্রেফতারের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছে। আর সেখানেও উঠে এসেছে দেশদ্রোহ আইন বাতিল করার দাবি।
তো ঠিক কী বলছে এই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো?
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া অধিকর্তা ব্র্যাড অ্যাডামসের কথায়, ‘ঢাকার শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের সম্পাদকদের বিরুদ্ধে যে ক্রিমিনাল চার্জ আনা হয়েছে, তা স্পষ্টতই দেশের সব গণমাধ্যমকে ভয় দেখানোর একটা কৌশল।’ সংস্থার দক্ষিণ এশিয়া ডিরেক্টর মীনাক্ষি গাঙ্গুলি আবার কানহাইয়া কুমার প্রসঙ্গে বলছেন, ‘ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।’
আসলে এই দুটো দেশের চলমান রাষ্ট্রদ্রোহ আইনকে ঘিরেই যাবতীয় বিতর্ক। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে বলা আছে দেশের সংবিধানের যে আদর্শ, বিশ্বাস বা চেতনা—তার মর্যাদাকে খাটো করার যেকোনও চেষ্টা বা ষড়যন্ত্রই রাষ্ট্রদ্রোহ বলে গণ্য হবে। মানবাধিকার কর্মীরা মনে করছেন, এই আইনটা খুবই ‘ব্যাপক আর অস্বচ্ছ’। এমনকি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে সব অঙ্গীকার আছে, (যেমন ইন্টারন্যাশনাল কোভ্যানেন্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিক্যাল রাইটস– ২০০০ সালে ঢাকা যা র্যাটিফাই করেছে), তার সঙ্গেও এই আইন সাংঘর্ষিক বলে তাদের অভিমত।
প্রায় অবিকল একই রকম সমস্যা ভারতীয় দণ্ডবিধির (ইন্ডিয়ান পেনাল কোড) ১২৪ (এ) ধারাটিকে নিয়েও, জেএনইউ ছাত্রনেতা কানহাইয়া কুমারের বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ যে ধারায় মামলা দিয়েছে। সাধারণভাবে এটি ভারতে দেশদ্রোহ আইন বলেই পরিচিত—আর এতে দেশের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানোর যেকোনও চেষ্টাই দেশদ্রোহ বলে গণ্য। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই আইনের প্রয়োগে নানা বিধিনিষেধ দিলেও পুলিশ তা প্রায়ই মানে না, নানা ছুতো-নাতায় প্রায়ই ঠুকে দেয় এই দেশদ্রোহের আইনে মামলা।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভাষা এ প্রসঙ্গে আরও কঠোর। তারা বলছে ‘ব্রিটিশ আমলে ভারতের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাকস্বাধীনতার অধিকার হরণ করতে এই দেশদ্রোহ আইন প্রয়োগ করা হতো। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের যে ভিন্নমতকে চুপ করিয়ে দিতে ভারত আজও এই আইনের প্রয়োগ করে চলেছে। ভারতীয় সমাজের স্বার্থেই দ্রুত এর অবলুপ্তি দরকার’।
বাংলাদেশ ও ভারতে দেশদ্রোহ আইন দরকার কি না, দরকার হলেও ঠিক কী আকারে তা থাকা প্রয়োজন—সেটা অন্য বিতর্ক। কিন্তু এই দাবির রেশ ধরে মাহফুজ আনাম ও কানহাইয়া কুমার যেভাবে একই মঞ্চের শরিক হয়ে উঠেছেন, তা এক আশ্চর্য সমাপতন কোনও সন্দেহ নেই!
কানহাইয়া কুমার বিহারের বেগুসরাই জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের গরিব পরিবারের সন্তান। এলাকাটা বামপন্থীদের গড় বলে পরিচিত, তাই লোকে সেটাকে ‘বিহারের লেনিনগ্রাড’ বলেই চেনে। কৃষক বাবা-মাও আগাগোড়া কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার সমর্থক ছিলেন, ছেলেও ওই দলের ছাত্র শাখার হয়ে লড়েই জেএনইউ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। কানহাইয়া নিজেই বলেছে, মাসে মাত্র তিন হাজার রুপিতে আজও তাদের সংসার চলে—নুন আনতে পান্তা ফুরোলেও বামপন্থী গর্ব অবশ্য আছে ষোলো আনা। এই পটভূমি থেকে উঠে এসেই কানহাইয়া ভারতের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিতর্কসভায় জয়ী হয়েছে, তুখোড় বাগ্মী হিসেবে জেএনইউ-র মতো এলিট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মাহফুজ আনামও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়নে তুখোড় তার্কিক ছিলেন–পাকিস্তান আমলে ইন্টার ইউনিভার্সিটি ডিবেটে বারবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তবে কানহাইয়া কুমারের সঙ্গে তার মিল বোধহয় ওটুকুতেই শেষ–বরেণ্য রাজনীতিক আবুল মনসুর আহমেদের ছেলে ও বনেদী পরিবারের সন্তান মাহফুজ আনামের সঙ্গে তার অন্য কোনও রকম তুলনাই চলে না। কর্মজীবনেও মাহফুজ আনাম অসম্ভব কৃতী, সেই জায়গায় কানহাইয়া এখনও শুধু একজন উদীয়মান ছাত্রনেতা।
কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতে দেশদ্রোহ আইনের প্রাসঙ্গিকতা আর সেই সংক্রান্ত বিতর্কই আজ অদ্ভুতভাবে এ দুজনকে কাছাকাছি এনে দিয়েছে। সীমান্তের দুপারে প্রায় দুহাজার মাইল দূরে, তবু পাশাপাশি!
/এমএনএইচ/