সাবের হোসেন চৌধুরী: ক্রিকেট সংগঠক থেকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত

ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান সাবের হোসেন চৌধুরী। পড়াশুনা করেছেন বিদেশে। দেশে ব্যবসার পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আওয়ামী লীগের মনোনয়নে চার বারের নির্বাচিত এমপি। সরকারের মন্ত্রিসভার কনিষ্ঠ সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির দায়িত্বও সামলিয়েছেন। সারা বিশ্বের সংসদ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত ‘ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ)’ সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত এই জনপ্রতিনিধি। বর্তমানে জাতীয় সংসদের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাকে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকায় থাকা সাবের হোসেন চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে তামাকবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি পরিবেশ ও জলবায়ু আন্দোলনের সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছেন। নবম জাতীয় সংসদে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময়ে তিনি জাতীয় সংসদে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ বিষয়ক বাংলাদেশ সর্বদলীয় পার্লামেন্টারি গ্রুপের সভাপতি হন। এছাড়া তিনি পার্লামেন্টারিয়ানস ফর নন প্রোলিফারেশন অ্যান্ড নিউক্লিয়ার ডিসআর্মামেন্ট (পিএনএনডি) এর সদস্য হন। দশম সংসদে তিনি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি হন। চলতি একাদশ সংসদে তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। চলতি সংসদের যেসব কমিটিগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, এর মধ্যে তার নেতৃত্বাধীন কমিটি অন্যতম। এই কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি বন বিভাগের বেদখল হওয়া জমি পুনরুদ্ধার, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ, পরিবেশ দূষণকারী ট্যানারি বন্ধ, হাতিসহ বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেন। এই কমিটির বেশি কিছু সুপারিশ ইতোমধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।

১৯৬১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণকারী সাবের হোসেন চৌধুরী যুক্তরাজ্যের উইন্টন গ্রামার স্কুল লন্ডন থেকে ‘ও’ এবং ‘এ’ লেভেল শেষে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (এসওএএস) থেকে অর্থনীতি ও পলিটিক্স বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে তিনি অ্যাকাডেমিক স্টেজ ফর কান্ট্রি টু দ্য বার লন্ডন থেকে আইন বিষয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি এমপি নির্বাচিত হন।

দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়িক পরিবারের সন্তান সাবের হোসেন মুক্তিযোদ্ধা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের আজীবন সদস্য। তিনি ২০০২ সালে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি অক্টোবর ২০০১ থেকে জানুয়ারি ২০০৯ সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ক্রীড়া সংগঠক সাবের হোসেন চৌধুরী ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ক্রিকেট খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বের কারণে ২০০০ সালে বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাসসহ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের পরিপূর্ণ সদস্য পদ লাভ করে। তার মেয়াদে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক ২০০১’ এ ভূষিত হয়।

বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়ন এবং বিশ্ব ক্রিকেটে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে আজীবন সদস্যপদ প্রদান করেছে মেরিলিবোর্ন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি), লর্ডস, লন্ডন। তিনি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) পরিচালক, এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি সরকারের নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি  সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

সাবের হোসেন চৌধুরী নবম জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বছরেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত আইন উন্নয়নসহ বস্তিবাসীদের অধিকার, সংসদ সদস্যদের জন্য কোড অব কনডাক্ট, পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ, কুষ্ঠ রোগীদের অধিকার রক্ষায় ফৌজদারি আইন পরিবর্তন এবং নাগরিক স্বাধীনতা বিষয়ক আইন সংসদে উত্থাপনের মাধ্যমে নতুন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নবম জাতীয় সংসদে তার আনা দুটি বেসরকারি বিল পাস হয়। এগুলো হলো—নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ বিল এবং লিপারস (রিপিল) বিল।

২০১৪ সালে ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সাবের হোসেন। সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় ১৩১তম সাধারণ অধিবেশনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী তিন প্রার্থীকে পরাজিত করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। একই বছরে বাংলাদেশের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশনের (সিপিএ) সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে বাংলাদেশের দুই নেতার দুটি সংগঠনের নেতৃত্ব প্রদান বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

এক প্রতিক্রিয়ায় সাবের হোসেন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া আমাকে একটি বিশেষ সুযোগ। এজন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।  সেইসঙ্গে  আমার দায়িত্ব চ্যালেঞ্জও বটে।’

ক্লাইমেট চেঞ্জ বর্তমানে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এর সঙ্গে মানুষের জীবন-জীবিকা জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাংলাদেশ নেতৃত্ব দিতে চায়। আমরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এটি নিয়ে কাজ করে যাবো।  গুরুত্বপূর্ণ এই  ইস্যুটি নিয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু-বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। সবার সহযোগিতা নিয়ে আমরা কাজ করতে চাই।’