বাংলাদেশ নিয়ে পাশ্চাত্য দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বিভিন্ন সময়ে মন্তব্য,বিবৃতি, রিপোর্ট, এমনকি রাজনীতিবিদদের চিঠিও প্রকাশ করা হচ্ছে। এছাড়া বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা বা ভিসানীতি ঘোষণা করা হচ্ছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য দেশের এ ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডকে চাপ হিসেবে দেখছেন গণমাধ্যম, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৈরি হওয়া বিশ্ব ব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে এবং নতুন ব্যবস্থা সংগঠিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ভূ-রাজনীতিতে একদিকে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, অপরদিকে অভ্যন্তরীণ সমস্যার পরিধি বেড়ে যাওয়ায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াও বেড়েছে বেশি মাত্রায়। একইসঙ্গে মিডিয়ার কারণে এসবের প্রচার আগের যেকোনও সময়ের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে।
এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, ‘বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা আগের চেয়ে অনেক বেশি। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের কৌশলগত নীতি প্রণয়নের সক্ষমতা রক্ষা করে চলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি কৌশলী হতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক মানচিত্রে নিজের পদচিহ্ন বজায় রাখার ক্ষেত্রে নানান বাধা বিভিন্নভাবে আসবে, এটিই স্বাভাবিক।’
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা আশির দশকে যখন কর্মক্ষেত্রে যোগদান করি, তখনকার বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট এবং এখনকার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ওই সময়ে দুর্নীতি একটি বড় বিষয় ছিল। কিন্তু এখন দুর্নীতির চেয়ে অধিকারভিত্তিক বিষয়, যেমন- গণতন্ত্র, মানবাধিকার বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়ে থাকে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তুর পরিধি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অনেক বেশি নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া আমরা দেখে থাকি।’
বাংলাদেশের গুরুত্ব
স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের কৌশলগত নীতি (স্ট্র্যাটেজিক সভরেনটি) প্রণয়নের অধিকার সব দেশেরই থাকার কথা। কিন্তু একটি দেশ চীনের প্রতি বেশি ঝুঁকবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ইন্দো-প্যাসিফিকের দৃঢ় সমর্থক হবে, সেই কৌশলগত নীতির সিদ্ধান্ত নেওয়া কিছুটা কঠিন বিষয় অনেক দেশের জন্য।
এ বিষয়ে শহীদুল হক বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন আর ছোট দেশ নেই। তার অর্থনৈতিক শক্তি ও সক্ষমতা এখন অনেক বেশি। পাশ্চাত্য বিশ্ব এখন তার বক্তব্য বা বিবৃতিতে বাংলাদেশকে উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে উল্লেখ করে। ফলে বাংলাদেশের পক্ষে কৌশলগত নীতির বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করা না হলে বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।’
অভ্যন্তরীণ সমস্যা
১৯৮৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের পরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে বাংলাদেশ নিয়ে একটি শুনানি হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মাদ এরশাদের দুর্নীতি, বাংলাদেশের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল।
এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ১৯৮৮ সালে যখন ওই শুনানি হয়, আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তবে তখনকার প্রেক্ষাপট এবং এখনকার প্রেক্ষাপট একেবারে আলাদা।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যার ব্যাপ্তি অনেক বেশি এবং সে কারণে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক যে প্রতিক্রিয়া, সেটিও বেশি।’
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘র্যাব তৈরি হয়েছে ২০০০ সালের পরে এবং এ সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে আরও পরে। ফলে র্যাব নিয়ে প্রতিক্রিয়া আগে ছিল না। এ থেকে বোঝা যায়, অভ্যন্তরীণ সমস্যার ব্যাপ্তি বাড়ার সঙ্গে বিষয়গত প্রতিক্রিয়ার পরিমাণ নির্ভর করে।’
হুমায়ুন কবির বলেন, ‘তবে এ বিষয়ে সমাজে যে আলোচনা— সেটির ব্যাপ্তি বেড়েছে মিডিয়ার প্রসারের ফলে। ১৯৮৮ সালের সেই শুনানি নিয়ে হয়তো কোনও খবর মিডিয়ায় প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু আজকে যেকোনও বিবৃতি বা মন্তব্য প্রকাশিত হয় এবং মানুষ সেটি নিয়ে আলোচনা করে।’
কী করা দরকার
বর্তমানে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতি একটি দোদুল্যমান অবস্থার মধ্যে রয়েছে। একই কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে।
জানতে চাইলে শহীদুল হক বলেন, ‘এ অবস্থায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজন গোটা পরিস্থিতি সম্পর্কে সঠিক ও সম্যক ধারণা লাভ এবং এরপর জাতীয় স্বার্থ বিবেচনা করে পদক্ষেপ নেওয়া। এ পরিস্থিতিতে বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত না নিলে বিপদের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উপকার পাওয়া যাবে। স্বল্পমেয়াদি লেনদেনভিত্তিক সম্পর্কের বদলে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সম্পর্কের দিকে এগিয়ে যাওয়া দরকার।’