এটিএম জালিয়াতির কমিশন পেতেন ব্যাংক কর্মকর্তারা!

এটিএম বুথে জালিয়াতিদেশি জালিয়াতদের সহায়তায় বিদেশি জালিয়াতরা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ক্লোনিং করে অর্ধশত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তারা জানান, এসব জালিয়াতির ঘটনায় বিভিন্ন ব্যাংকের শতাধিক ব্যাংক কর্মকর্তা নিয়মিত কমিশন পেতেন। এখন সেসব দেশি জালিয়াতকে ধরতে মাঠে নেমেছেন তারা। দেশি চক্রটির বড় অংশই বিভিন্ন ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনে কর্মরত। গ্রেফতার হওয়া বিদেশি নাগরিক পিটারসহ সিটি ব্যাংকের তিন কর্মকর্তার কাছ থেকে ওই বিশাল চক্রের সন্ধান পান গোয়েন্দারা। গ্রেফতারকৃতদের বক্তব্য যাচাই-বাছাই করে কার্ড জালিয়াতির অন্য হোতাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তারা।
কার্ড জালিয়াতির ঘটনায় তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানান, কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে বিভিন্ন ব্যাংকের শতাধিক কর্মকর্তা জড়িত। প্রতারক চক্রের সঙ্গে জড়িত এ সব ব্যাংক কর্মকর্তা কমিশনের ভিত্তিতে দেশি-বিদেশি জালিয়াতদের গ্রাহকদের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের গোপন তথ্য দিয়েছেন।
প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তাদের আটক করা হবে বলে জানান গোয়েন্দা পুলিশের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। তিনি জানান, প্রতারক চক্রের সদস্য কয়েকটি ব্যাংকের আরও ১০ কর্মকতাকে এরইমধ্যে চিহ্নিত করে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের মোবাইল ফোনের কললিস্ট সংগ্রহ করে সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গোয়েন্দারা আরও জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম কার্ড জালিয়াতি করে টাকা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে। পিটার এই চক্রের মূল হোতা। তার সঙ্গে ছিল আরও চার বিদেশি নাগরিক ও লন্ডনপ্রবাসী ফরিদ নাবির চৌধুরী নামের এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি। তাদের মধ্যে দুজন কয়েক মাস আগে ও বাকি দুজন চলতি মাসের ১৩ ও ১৪ তারিখে দেশে চলে যান। ফরিদ নাবির চৌধুরী লন্ডন চলে যান এ মাসের প্রথম সপ্তাহে।

গোয়েন্দারা জানান, বাংলাদেশে এসে তারা প্রথমে দেশি জালিয়াতদের খুঁজে বের করে। লন্ডন প্রবাসী ফরিদ নাবির চৌধুরীর মাধ্যমেই খুঁজে বের করে সিটি ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনের কর্মকর্তা ও প্রতারক চক্রের সদস্য মাকসুদকে। মাকসুদ নিজের দলে ভিড়িয়ে নেন রেজাউল ও রেফাজকে। এরপর পরিকল্পনা করে কার্ড জালিয়াতি করে টাকা তুলে নেওয়া শুরু করে প্রতারক চক্রটি। তবে, এই চক্র মোট কত টাকা জালিয়াতি করে তুলে নিয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি। যদিও চারটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৪০টি এটিএম কার্ডের বিপরীতে প্রায় ২০ লাখ টাকা চুরির কথা বলা হচ্ছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই চক্র অন্তত শত কোটি টাকা এরইমধ্যে হাতিয়ে নিয়েছে। অনেক ব্যাংকই সুনাম হারানোর ভয়ে এটিএম জালিয়াতির বিষয়টি গোপন রেখে গ্রাহকদের সঙ্গে সমঝোতা করে ফেলেছেন। তারা  জানান, পিটার আন্তর্জাতিক ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা। তার নেতৃত্বে ২০ থেকে ২৫ জন প্রতারক ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কার্ড জালিয়াতি করে বেড়ান। প্রায় চার বছর আগে একবার বাংলাদেশে এসেছিলেন পিটার। এরপর ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বৃটিশ নাগরিক ফরিদ নাবির চৌধুরীসহ বাংলাদেশে আসেন তিনি। তারা একসঙ্গেই গুলশানের হোটেল হলিডে প্লানেটে ওঠেন। এরপর একে-একে বাংলাদেশে আসেন বুলগেরিয়ান এন্ডারসন ও ইউক্রেইনের রোমিও। তারা বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম জালিয়াতি নিয়ে পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী দেশীয় এজেন্ট হিসেবে মাকসুদকে খুঁজে বের করে তারা।

জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা গোয়েন্দাদের আরও জানান, প্রতারকরা বাংলাদেশে আসার সময়েই বিদেশ থেকে স্কিমিং ডিভাইস নিয়ে আসে। সেই ডিভাইস দিয়ে জালিয়াতির জাল পেতে হাতিয়ে নেয় কোটি কোটি টাকা। গোয়েন্দাদের ধারণা, গত কয়েক মাস ধরেই পিটারের এই চক্রটি এটিএম বুথ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কাজটি করে আসছিল। কিন্তু ব্যাংকগুলো নিজেদের সুনামের কথা ভেবে এগুলো ফাঁস করেনি। মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে পিটারে দুই সহযোগী রোমানিয়ান কয়েক মাস আগেই দেশ ছেড়ে যায়। অন্য দুজন অ্যান্ডারসন ওরফে অ্যান্ড্রি ও রোমিও পিটারের সঙ্গেই ছিলেন। এটিএম বুথ থেকে টাকা চুরির বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রচারিত হওয়ার পর তারাও দেশ ছেড়ে যান। এর আগে গত ৩ ফেব্রুয়ারি লন্ডন চলে যান বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরিদ নাবির চৌধুরীও। তিনিও মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছেন বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।

এদিকে, রবিবার রাতে পোলিশ নাগরিক পিটারসহ সিটি ব্যাংকের অন্য তিন কর্মকর্তাকে গ্রেফতারের পর রিমাণ্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্ট ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা ও অপরাধ তথ্য বিভাগের সদস্যরা। জিজ্ঞাসাবাদে পিটার সহজে মুখ খুলছে না বলে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তারা পিটারের সঙ্গে বাংলাদেশি আর কোনও ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজেশ রয়েছে কি না—তা জানার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে পিটারের সহযোগী বিদেশি নাগরিকদের বিষয়েও বিস্তারিত খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে তাদের ধরতে ইন্টারপোলের সহযোগীতা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে প্রযুক্তি সহায়তা দিচ্ছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের সাইবার নিরাপত্তা কর্মসূচির ফোকাল পয়েন্ট তানভীর হাসান জোহা ও তার দল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, জালিয়াতির বিষয়টি ব্যাংক সংশ্লিষ্ট লোক ছাড়া কখনও সম্ভব নয়। এরইমধ্যে তারা বিদেশি কার্ড জালিয়াতদের পাশাপাশি দেশি জালিয়াতদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু হয়েছে। বেশ কিছু জালিয়াতকে এরইমধ্যে শনাক্ত করে তাদের আরও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের নজরদারিতে রেখেছেন বলেও জানান তিনি।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মোহাম্মদ শাজাহান জানান, পিটারকে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুরো চক্রের সবার সম্পর্কে তথ্য আদায়ের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে তিনি এখন পর্যন্ত কত টাকা জালিয়াতি করেছেন, তা জানার চেষ্টা চলছে। পিটার অনেক ধূর্ত। তিনি অনেক তথ্যই গোপন করার চেষ্টা করছেন। তাকে নানা কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর বনানী ও মিরপুর এলাকার বিভিন্ন বুথ থেকে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের টাকা খোয়া যায়। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগীরা ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানালে বিষয়টি সবার নজরে আসে। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পায়। এরপর গত শুক্রবার ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল)-এর পক্ষ থেকে বনানী থানায় তথ্য-প্রযুক্তি আইন ও পেনালকোডের ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। ইউসিবিএলের পক্ষে মামলাটি দায়ের করেন ব্যাংকের কর্মকর্তা মাহবুব উল ইসলাম খান।

এছাড়া, সিটি ব্যাংকের পক্ষ থেকেও পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। দুটো মামলাই তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া বিদেশি নাগরিক পিটারসহ চারজন ছয় দিনের রিমান্ডে রয়েছেন।

/এমএনএইচ/আপ-এফএস/