‘আমি মেয়ে হিসেবে এখন জীবন-যাপন করি। কিন্তু আমাকে ছেলে বাচ্চা হিসেবে স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল। পুরো স্কুলজীবন আমি বুলিং-এর শিকার হয়েছি। এমনকি আমার শিক্ষকরাও আমার কথা বলা, হাঁটার ধরনকে কেন্দ্র করে হাসিঠাট্টা করতেন। এক সময় মনে হতে থাকে আমার মতো শিশুকে পড়ালেখা চালাতে হলে— এসব মেনে নিয়েই চলতে হবে। স্কুল, খেলার মাঠ কিংবা পাড়া প্রতিবেশী কোনোটাকেই আমার নিজের জায়গা মনে হয়নি। পরিবেশের কারণে, হেনস্তার কারণে পরিবারের মানুষ হিজড়া শিশুকে স্কুলে রাখার সাহস করে না।’ কথাগুলো বলছিলেন ট্রান্সজেন্ডার হোচিমিন ইসলাম। জীবনের চড়াই উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে আজ তিনি নিজ পরিচয় তৈরি করেছেন বটে, কিন্তু সমাজের কাছে তার প্রশ্ন— বাকি হাজারো হিজড়াকে লুকিয়ে থাকতে হয় কেন?
সোনালী (ছদ্মনাম) অনেক কষ্টে নিজেকে লুকিয়ে পড়ালেখা শেষ করেও নিস্তার পাননি। কাজের জায়গায় পরিচয় গোপন রাখতে বলা হয় তাকে। এমনকি পুরুষদের পোশাক পরতে ও পুরুষদের মতো আচরণ করতে বাধ্য করা হয়। পরে, সহকর্মীরা জানতে পারলে নানাভাবে যৌন হয়রানির চেষ্টা চালায় বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করবেন কীভাবে? ছোট থেকে বড় সবাই আমাদের নিয়ে মজা করে, ঘৃণা করে। অথচ আমাদের এই পরিচয়ের জন্য আমরা দায়ী না, ঠিক যেমন- আপনার নারী বা পুরুষ হওয়াটা আপনার হাতে নেই। আমরা যখন স্কুলে পড়েছি, আমরা অনেকেই হিজড়া ছিলাম। আমরা পরস্পরকে চিনতাম, কিন্তু পরিচয় গোপন রাখতাম। যদি এরা নিজেদের লুকিয়েই রাখে, তাহলে আপনি কর্মসূচি নেবেন কাদের জন্য, বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজভুক্ত করবেন কাদের?’
বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে হিজড়াদের স্বীকৃতি দিলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে তাদের। গোড়ায় গলদ দেখতে পায় শিক্ষায় অনুরাগী বর্তমান প্রজন্মের হিজড়ারা। তারা বলছেন, সরকার নানা উদ্যোগের কথা বলছে, করছেও কোথাও কোথাও। কিন্তু সমাজে সচেতনতা নিয়ে কোনও কথা নেই। স্কুলে ভর্তির পর থেকে যে পরিমাণ হেনস্তা হতে হয়, সেখানে শিক্ষিত হয়ে সমাজের মূলধারায় মিশতে পারার কোনও সুযোগ রাখা আছে বলে তারা মনে করছেন না। এমনকি সরকারি কর্মসূচির সঙ্গে জড়িতরাও বলছেন, তারা যে পরিমাণ বৃত্তি ও ভাতা নিয়েছেন, তা সংখ্যায় কম হলেও সেটুকুও তারা সমাজেকে দিতে পারছেন না। সব বিবেচনায় হিজড়া অধিকার নিয়ে কাজ করছেন যারা তারা বলছেন, এখনও ফোকাসের বাইরে হিজড়া জনগোষ্ঠীর বসবাস।
পরিসংখ্যান নিয়ে আছে গোলমাল
বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সঠিক কোনও পরিসংখ্যান নেই। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে হিজড়াদের সংখ্যা ২৪ হাজারের কিছু বেশি। অপরদিকে ‘হিজড়া কল্যাণ ফাউন্ডেশনের’ দাবি বাংলাদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ১২ লাখ। সরকারি হিসাব মতে, দেশে হিজড়াদের সংখ্যা ১৩ হাজার। তবে হিজড়াদের অধিকার আদায়ে কর্মরত বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে হিজড়াদের সংখ্যা দেড় লাখ হতে পারে। দেশে বসবাসরত হিজড়া জনগোষ্ঠী মূলত কোনও ধরনের আর্থ-সামাজিক কর্মকাণ্ডে স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণ করতে পারে না। তারা বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে সমাজে অগ্রহণযোগ্যভাবে জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। অধিকারকর্মীরা বলছেন, প্রথমত, এই জনগোষ্ঠীর কত জন আপনার দেশে আছে, সেটাই যদি না জানা থাকে, তবে আপনি কার জন্য কাজ করবেন। আমরা সরকারি-বেসরকারি সংস্থা সম্মিলিতভাবে যদি ভাবি— হিজড়া জনগোষ্ঠী কী প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক জীবন পাবেন, তবে সেটা অসম্ভব হওয়ার কোনও কারণ নেই। খুব সতর্কতার সঙ্গে সচেতনতামূলক কার্যক্রম হাতে নেওয়ার পাশাপাশি ছোটবেলা থেকে সে যেন অন্য শিশুদের মতোই বেড়ে উঠতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে গত ৫ জুলাই সমাজে অবহেলিত হিজড়া জনগোষ্ঠীকে মাসিক ভাতা, পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সুবিধা প্রদানের দাবিতে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবকে এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান এ নোটিশ পাঠিয়েছেন।
নোটিশে বলা হয়েছে, ‘হিজড়া জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সবচেয়ে অবহেলিত জনগোষ্ঠী। তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন, সমাজ থেকে অবহেলিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈষম্যের শিকার।’
স্কুলে খোঁজ মেলে না হিজড়া শিক্ষার্থীর
হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য হচ্ছে— স্কুলগামী হিজড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চার স্তরে (মাসে জনপ্রতি প্রাথমিকে ৭শ টাকা, মাধ্যমিকে ৮শ, উচ্চ মাধ্যমিকে এক হাজার টাকা এবং উচ্চশিক্ষায় ১২শ টাকা হারে) উপবৃত্তি প্রদান করা হয়। স্কুল পর্যায়ে ১২২৫ জন হিজড়া শিক্ষার্থীর অনুকূলে এই উপবৃত্তি দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ আছে— এই সংখ্যক হিজড়া স্কুলে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই না পাওয়ার কারণ হিসেবে অধিকার কর্মীরা বলছেন, যেহেতু হেনস্থা হতে হয়, সেহেতু তারা নিজেদের হিজড়া পরিচয় প্রকাশ করে না।
সমাজসেবা অধিদফতরের উপপরিচালক (ভিক্ষুক, চা শ্রমিক ও হিজড়া) মো. শাহজাহান বাস্তব পরিস্থিতি উল্লেখ করে বলেন, ‘মাত্র ১২২৫ জনের উপবৃত্তি বরাদ্দ আছে। বিদ্যালয়গুলোতে তাদেরকে পাওয়া যায় না।’ কেন পাওয়া যায় না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কৈশোরের আগে হিজড়া শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ফলে তত দিন এই টাকাটা কাউকে দেওয়া যাচ্ছে না। আর বয়োঃসন্ধিকালে যখন শনাক্ত হচ্ছে, তখন অস্বীকার করার প্রবণতা বেশী। ফলে এখন দরকার ব্যাপক সচেতনতা বৃদ্ধি। তা না-হলে আসলে কোনও কর্মসূচিই কাজে লাগবে না।’
সচেতনতার অংশ হিসেবে অটিস্টিক শিশু ও হিজড়াদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে কারিকুলামে ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানান— জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মশিউজ্জামান। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘হিজড়াদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তার প্রতি সহপাঠীদের সহনশীল আচরণ প্রয়োজন সবার আগে। হিজড়াদের নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা তৈরিরও ব্যবস্থা থাকবে। সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ে তাদের বিষয় যুক্ত করা হবে।’
করণীয় জানতে চাইলে ট্রান্স নারী হোচিমিন বলেন, ‘সরকার কর্মসূচিগুলো কার্যকর করতে পারছে না, উপবৃত্তি দেওয়ার শিক্ষার্থী পাচ্ছে না। এটা বললে তো হবে না। কেন পাচ্ছে না সেটা বের করে সমাধান করতে হবে। কেবল স্কুল না, কোনও পর্যায়েই হিজড়াদের সুযোগ করে দেওয়া হয় না। যেটা তাদের অধিকার সেটাও দেওয়া হয় না। এসব বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।’
চলমান প্রশিক্ষণ কতটা কাজে লাগে?
হিজড়া জনগোষ্ঠীকে আত্মনির্ভরশীল করে সমাজে সমঅধিকার ও সাম্যতার ভিত্তিতে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে চাহিদার ভিত্তিতে দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। সমাজসেবা কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ মডিউলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো হচ্ছে— হেয়ারকাটিং, বিউটিফিকেশন, ড্রাইভিং, কম্পিউটার, সেলাই, কাটিং, ব্লক, বাটিক ও হস্তশিল্প। এসব প্রশিক্ষণে আদৌ লাভবান হচ্ছেন কিনা প্রশ্নে ‘বন্ধু’ সংগঠনের পাবলিক রিলেশন্স ও কমিউনিকেশনের দায়িত্বে থাকা রুহুল রবিন খান বলেন, ‘প্রশিক্ষণ কেবল দেওয়াই হচ্ছে। তা হিজড়াদের জীবনে কোনও ভ্যালু ক্যারি করছে না পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে। তাদের ডেকে নিয়ে নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এরপরে তারা কী করবে, তার কোনও পরিকল্পনা নেই, মনিটরিং নেই পরবর্তী সময়ে। ফলে আবার তাদের আগের পেশাতেই ফিরতে হচ্ছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে জীবনমান উয়ন্নন করেছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই।’ করণীয় উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কর্মসংস্থান করে দেওয়া গেলে উপকারটা পাওয়া যেতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটি এখন পর্যন্ত নামমাত্র।’ ভাতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ জনশুমারির তথ্যমতে, বাংলাদেশে হিজড়া আছে ১২ হাজার ৬শ’র কিছু বেশি। ৫০ এর ওপরে যাদের বয়স, তাদের জন্য ভাতা বরাদ্দ আছে। তবে ৫০ এর বেশি বয়সের হিজড়ার দেখা সহজে পাওয়া যায় না। ফলে বরাদ্দকৃত টাকার বেশিরভাগই খরচ হয় না। শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই বিষয়। উপবৃত্তি যাদের দেবেন, তাদের কোথায় পাবেন। তারা তো নিজেদের পরিচয় দেওয়ারই সাহস পায় না।’