পিলখানা ট্রাজেডি

ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষ পর্যায়ে, বিস্ফোরক মামলার সাক্ষ্য চলছে নিম্ন আদালতে

 
পিলখানা হত্যার আসামিরাপিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় দায়ের হওয়া দুটি মামলা চলছে দুই গতিতে। হত্যা মামলাটি চলছে দ্রুততার সঙ্গে। অন্যদিকে বিস্ফোরক মামলাটি চলছে খুবই ধীরগতিতে। যার কারণে বিচারপ্রার্থী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। কয়েকজন আসামী কারাগারে আটক থাকা অবস্থায়ই মারা গেছেন। সঠিক সময়ে বিচার সম্পন্ন হলে এদের অনেকে হয়তো মামলায় খালাস পেয়ে যেতেন। এতে আসামিরা ন্যায় বিচার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। এমনই অভিযোগ মামলা দুটির আসামী পক্ষের আইনজীবীদের। তবে আসামিপক্ষের এমন অভিযোগ করার কোনও অধিকার নেই বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা।
বিজিবির সদর দফতর পিলখানায় দেশের ইতিহাসের নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞ চলে ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি। বিপথগামী বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের হাতে ওই দু’দিনে বিজিবির তখনকার মহাপরিচালক (ডিজি) মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন চৌকস সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। এছাড়াও বেসামরিক ও বিডিআর সদস্যসহ আরও ১৭ জন নিহত হন বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায়। নিহত এই ১৭ জনের মধ্যে ডিজির স্ত্রীসহ সাতজন বেসামরিক ব্যক্তি, নয়জন বিডিআর সদস্য ও একজন সেনা সদস্য রয়েছেন।
নৃশংস এ হত্যাযজ্ঞ ও বর্বরতার পর প্রথমে লালবাগ থানায় ও পরে নিউমার্কেট থানায় সদর ব্যাটালিয়নের ডিএডি তৌহিদুল আলমসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দায়ের করে পুলিশ। এ মামলায় কয়েক হাজার বিডিআর সদস্যকে অজ্ঞাতনামা হিসেবে আসামি করা হয়।
২০১০ সালের ১২ জুলাই পিলখানা হত্যা মামলায় ৮২৪ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।পরে সম্পূরক চার্জশিটে আরও ২৬ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়াও বিস্ফোরক আইনে ৭৮৭ জনকে অভিযুক্ত করে আলাদা একটি অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। পরে রাজধানীর বখশিবাজারে মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিশেষ এজলাস বসিয়ে ২০১১ সালের ৫ জানুয়ারি দু'টি মামলার বিচারকাজ একসঙ্গে শুরু করা হয়। একপর্যায়ে বিস্ফোরক মামলার কাজ স্থগিত রেখে হত্যা মামলার কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
দীর্ঘ দুই বছর বিচার কার্যক্রম শেষে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত। এ রায়ে ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন ও ২৬২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়।বেকসুর খালাস দেওয়া হয় ২৭১ জনকে।এ মামলায় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু এবং আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক বিডিআর সদস্য তোরাব আলীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টু সর্বশেষ রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে,গত বছরের ৩ মে তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান,হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তিনি মারা গেছেন।
ঘটনার পর বাহিনীর নিজস্ব আইনেও পিলখানাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ৫৭টি বিদ্রোহ মামলা দায়ের করা হয়। এসব মামলায় ছয় হাজারেরও বেশি বিডিআর সদস্যকে আসামি করা হয়।৫৭টি বিদ্রোহ মামলায় বিডিআরের নিজস্ব আইনে গঠিত বিশেষ আদালতে পাঁচ হাজার ৯২৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।২০১২ সালের ২০ অক্টোবর সদর রাইফেল ব্যাটালিয়নের ৭২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ৫৭টি বিদ্রোহের মামলার নিষ্পত্তি করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান,বিস্ফোরক মামলাটি বিচারাধীন থাকায় হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া ২৭১ জনের সবাই এখনও কারাগারেই বন্দি আছেন।আসামি পক্ষের আইনজীবিদের অভিযোগ, বিস্ফোরক মামলাটি যদি দ্রুত শেষ করা হতো তাহলে এদের অনেকেই মুক্তি পেয়ে যেতেন। আসামি পক্ষের সিনিয়র আইনজীবী আমিনুল ইসলাম বলেন,উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিস্ফোরক মামলাটি বিলম্বিত করা হচ্ছে। তবে সেই উদ্দেশ্যটা কি সেটা বলেননি তিনি।
অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শত শত আসামির এ মামলাটি পরিচালনায় রাষ্ট্রপক্ষেরও বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে আসামিরাও বিনা বিচারে বছরের পর বছর কারাগারে রয়েছেন। যা খুবই পীড়াদায়ক। এ মামলার কারনেই হত্যা মামলায় খালাস পাওয়া আসামিরা আজও  মুক্তি পাননি। কবে নাগাদ শেষ করা হবে সেটার কোনও নিশ্চয়তা নেই। তবে হত্যা মামলাটির ডেথ রেফারেন্সের শুনানি এ বছরেই শেষ হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
শতাধিক আসামির আরেক আইনজীবি শামীম সরদার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, বিচারপতি মো. শওকত হোসেন, বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিক ও বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদারের সমন্বয়ে গঠিত একটি বৃহত্তর বেঞ্চে ২০১৫ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের (নং-৫৮/২০১৩) শুনানি চলছে। এরইমধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের পেপারবুক পড়া ও ঘটনার ওপর শুনানি শেষ করেছে। বর্তমানে আসামিপক্ষের শুনানি চলছে। ১৫২ আসামির মধ্যে এরইমধ্যে ১১০ জনের তথ্যগত শুনানি হয়ে গেছে। এরপর আইনগত শুনানি শুরু হবে। আসামিপক্ষের শুনানি শেষে রাষ্ট্রপক্ষ আবার এর জবাব দেবেন।
হত্যা মামলায় উচ্চ আদালতে ন্যায় বিচার পাওয়ার আশা করে অ্যাডভোকেট শামীম সরদার আরও বলেন,অনেক নির্দোষ আসামি রয়েছেন। যারা এ মামলা থেকে খালাস পেতে পারেন। নিম্ন আদালত খালাস দিয়েছেন ২৭১ জনকে। কিন্তু বিস্ফোরকের মামলা শেষ না হওয়ায় তারা আজও কারাগার থেকে বের হতে পারেননি। বিস্ফোরকের মামলা নিষ্পত্তি হলে সেই মামলা থেকেও অনেক আসামি খালাস পেয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি। একই ঘটনায় একাধিক মামলা হলে সবগুলো মামলারই একসঙ্গে বিচার করার কথা। কিন্তু অজ্ঞাত কারনে রাষ্ট্রপক্ষ হত্যা মামলার মতো বিস্ফোরক মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেয়নি। যে কারনে আসামিরা বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার শিকার হয়ে ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বখশি বাজারে মহানগর দায়রা জজ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে এখনও বিস্ফোরক মামলাটির বিচার কার্যক্রম চলছে। এ পর্যন্ত এ মামলায় ২৯ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের সিনিয়র আইনজীবি মোশাররফ হোসেন কাজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বিস্ফোরক মামলা নিয়ে আসামি পক্ষের আইনজীবিদের অভিযোগ করার কোনও অধিকার নেই। হত্যা মামলায় সাজা হওয়ার পর আসামিদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারনে আসামিদের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য পায়। সেই কারনেই বিস্ফোরক মামলার কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছিলো। হত্যা ও বিস্ফোরক মামলা দু’টোই এ বছরের শেষ নাগাদ শেষ করা যাবে বলে তিনি জানান।
বিদ্রোহের সময় দু'দিনের চিত্র: মামলার অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ঘটনার সময় পুরো পিলখানায় বিডিআরের সদস্য ছিলেন ছয় হাজার ৯০৩ জন। দরবার হলে ৯৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ বিডিআরের দুই হাজার ৪৮৩ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। বিদ্রোহের সময় দুই হাজার ৪১৪টি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে বিদ্রোহীরা গুলি করেছিল। এর মধ্যে এক হাজার ৮৪৫টি রাইফেল, ৫২৮টি সাব মেশিন গান, ২৩টি পিস্তল ও ১৮টি এলএমজি ছিল। ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিদ্রোহী বিডিআর সদস্যদের হাতে ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হন।

/ জেইউ/এপিএইচ/এমএসএম