জনপ্রতিনিধিদের কথা রাখতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় ব্রিজ বা কালভার্ট তৈরি করতে হয় বলে দাবি করেছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে কমিটির সদস্যদের নানা অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে এমন দাবি করেন।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কার্যবিবরণী সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। গত ২২ জুন অনুষ্ঠিত কমিটির ২৩তম বৈঠকে এলজিইডির কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা হয়। বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) অনুষ্ঠিত আগের বৈঠকের আলোচনার কার্যবিবরণী উপস্থাপন ও অনুমোদন দেওয়া হয়।
জানা গেছে, বৈঠকে দেশের গ্রামীণ এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়নে এলজিইডির ব্যাপক ভূমিকার পাশাপাশি তাদের কাজের মানসহ নানা ত্রুটি, ধীরগতিসহ বেশ কিছু অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কার্যবিবরণী সূত্রে জানা গেছে, আগের বৈঠকে কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ অভিযোগ করেন, দেশে বিভিন্ন স্থানে যেসব ব্রিজ তৈরি হচ্ছে, তা যথাযথভাবে সার্ভে না করেই তৈরি হচ্ছে। এতে করে অ্যাপ্রোচ রোডের সমস্যা হচ্ছে। ব্রিজ এমনভাবে করা হচ্ছে যে, বর্ষাকালে তার নিচ দিয়ে নৌকা চলাচল করতে পারে না। তৈরির সময় ব্রিজটির সার্ভে ঠিকমতো হয়নি। কতটুকু উঁচু করলে নৌকা চলাচল করতে পারবে, তা দেখা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনের তুলনায় রক্ষণাবেক্ষণের টাকা কম দেওয়া হয়। কিন্তু যা দেওয়া হয় তার সঠিক ব্যবহার করা উচিত।’ তিনি গ্রাম বা শহরের বাজারের পাশে রাস্তা নির্মাণের সময় ড্রেন তৈরির পরামর্শ দেন।
বৈঠকে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘জরিপ না করে কাজ করা হয়, যা কোনোভাবেই ঠিক না। ভালোভাবে জরিপ করে কাজ করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘এলজিইডি গ্রামসহ সারা দেশে অনেক কাজ করেছে। কিন্তু তাদের কাজের সময় বা হার নিয়ে বাংলাদেশের জনগণ এবং সরকার কেউই খুশি নয়। তাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের হার বাড়াতে হবে।’
প্রকল্প বাস্তবায়নের হার কম হওয়ার কারণ হিসেবে প্রকল্প-পরিচালকরা ঘটনাস্থলে প্রায়শই থাকেন না বলে অভিযোগ করেন মন্ত্রী।
বৈঠকে এসব অভিযোগ খণ্ডন করেন এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন। তিনি বলেন, ‘ব্রিজের হাইট এবং লেন্থ নিয়ে কথা হয়েছে। হাইড্রোলোজিক্যাল এবং মর্ফোলোজিক্যাল স্টাডি ছাড়া তারা কোনও প্রকল্প করেন না।’ প্রধান প্রকৌশলী এ সময় জনপ্রতিনিধিদের চাপাচাপিতে অপ্রয়োজনীয় ব্রিজ বা কালভার্ট নির্মাণের কথাও দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘তাদের জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কাজ করতে হয়। এজন্য তাদের কথা রাখতে গিয়ে কিছু অপ্রয়োজনীয় ব্রিজ-কালভার্ট করতে হয়। অবশ্য প্রধান প্রকৌশলী কোনও ধরনের জনপ্রতিনিধিদের কথা বলেছেন, তা কার্যবিবরণীতে স্পষ্ট করা হয়নি। দেশে জনপ্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় সংসদের সদস্য ছাড়াও জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার নির্বাচিত প্রতিনিধি রয়েছেন।
এদিকে বৈঠকে এলজিইডি’র রক্ষণাবেক্ষণ খাতে অপ্রতুল বরাদ্দের কথা উঠে আসে। এলজিইডির মতে, তাদের বছরে ৯ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এর বিপরীতে গত অর্থবছরে তাদের বরাদ্দ ছিল ৩ হাজার কোটি টাকা। অবশ্য রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগের আরএডিপিতে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে পরিকল্পনা সচিব বৈঠককে জানান।
আগের বৈঠকে জানানো হয়, এলজিইডির আওতায় প্রায় ৩ তিন লাখ ৫৮ হাজার কিলোমিটার গ্রামীণ রোড নেটোওয়ার্ক আছে। এর মধ্যে এক লাখ ৫৮ হাজার কিলোমিটার পাকা সড়ক। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৩ পর্যন্ত এলজিইডি ৭১ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার সড়কের কাজ করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়।
ওই বৈঠকে পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রসঙ্গও উঠে আসে। জবাবে মন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টা নিয়ে খুব বিরক্ত। অনেক পার্টি ওয়েস্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার কথা বলে। কিন্তু অনুমোদন দিলে তারা আর আসে না। এই রকম অনেকগুলো প্রকল্প মাঠে মারা গেছে।’
কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৃহস্পতিবারের বৈঠকে কমিটির সদস্য পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান, মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম, মনজুর হোসেন এবং আদিবা আনজুম মিতা অংশগ্রহণ করেন। বৈঠকে বিশেষ আমন্ত্রণে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে ‘বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি বিল, ২০২৩’ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংসদে রিপোর্ট উত্থাপনের সিদ্ধান্ত হয় বলে সংসদ সচিবালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।