রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসী সংগঠন নিয়ে সঠিক তথ্য আছে?

গোয়েন্দা সংস্থার বরাতে বিভিন্ন সময় কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় সন্ত্রাসী সংগঠনের সংখ্যা ও অনুসারীদের সংখ্যার বিষয়ে যেসব তথ্য পাওয়া যায় তা পূর্ণাঙ্গ নয় বলে দাবি ক্যাম্পে অবস্থানরত বিভিন্ন সংগঠনের অনুসারীদের। সম্প্রতি ক্যাম্পগুলোতে সাড়ে ৪০০ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) অনুসারী আছে বলে গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে প্রকাশিত খবর উল্লেখ করে তারা বলেন, ১০ লাখ মানুষের মধ্যে মাত্র সাড়ে ৪০০ জন দিয়ে এতগুলো ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় না। এদিকে ক্যাম্পে আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা এপিবিএন বলছে, সংখ্যা নিয়ে কিছু বলতে চাই না। প্রকাশ্যে অপরাধমূলক কার্যক্রম অনেকাংশেই কমেছে। যদিও নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক এপিবিএন সদস্য বলছেন, আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মকাণ্ড থেমে নেই।

 
সংখ্যা নিয়ে কেন সন্দেহ

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তার সম্প্রতি দেওয়া এক তথ্য নিয়ে এই সন্দেহ শুরু হয় যে আসলেই ক্যাম্পে মাত্র ৪৫০ জন আরসা সদস্য রয়েছে, নাকি ওই সংখ্যা আরও বেশি। বলা হয়, উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাড়ে ৪০০ আরসা সদস্য সক্রিয় রয়েছে। এখন তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছে ওস্তাদ খালেদ। এ অবস্থায় ক্যাম্পজুড়ে নজরদারি বাড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত জুলাই মাসের শুরুতে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকেছে ভারী অস্ত্রের একটি চালান। এই অস্ত্রের চালান ক্যাম্পে ঢোকাতে রোহিঙ্গা নারী-শিশুদের ব্যবহার করা হয়েছে। মিয়ানমারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরাকান স্যালভেশন আর্মির (আরসা) শীর্ষ নেতা ওস্তাদ খালেদের নেতৃত্বে অস্ত্রের এই চালান খালাস করা হয়। এরও আগে গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ১০টি দুর্বৃত্ত দল বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে। এরমধ্যে আরসা সক্রিয় রয়েছে উখিয়া, বালুখালী, পালংখালী, হোয়াইক্যংয়ে। আরএসও এবং মাস্টার মুন্নার দল উখিয়া, পালংখালীতে, ইসলামী মাহাজ ও জাবু ডাকাত দল হোয়াইক্যংয়ে এবং নয়াপাড়া ক্যাম্পে চাকমা ডাকাত দল, নবী হোসেন ডাকাত দল, পুতিয়া ডাকাত দল, সালমান শাহ ডাকাত দল, খালেক ডাকাত দল সক্রিয় আছে।

তবে আরসার অনুসারী এক রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তুলনামূলক অন্য সক্রিয় গোষ্ঠীর মধ্যে আরসা একটু সংগঠিত। তাদের সংগঠনের অনেক লেয়ার আছে। এমনকি সেসবের মধ্যে সব কয়টা স্তরের কাজ দৃশ্যমানও না। সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিম, রিসার্চ টিম, এমনকি সুইসাইড স্কোয়াড তৈরির কথাও সংগঠনগুলোর কাঠামোর মধ্যে ভাবা হয়ে থাকে। কুতুপালং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দিক থেকে অন্যদের থেকে এগিয়ে। সেখানে কথা হয় স্টুডেন্টস মুভমেন্টে জড়িতদের সঙ্গে। কেন অস্ত্র মজুতের দরকার হচ্ছে প্রশ্নে ছাত্রনেতারা বলেন, নানা ধরনের ইনসিকিউরিটি ফিলিং আছে। যারা ক্যাম্প অস্থির করতে চায় তাদের ভূ-রাজনৈতিক ফায়দা আছে, মাদকের ব্যবসা আছে। ফলে ক্যাম্পে আধিপত্য কার কত সেটা শো করার ব্যাপারও আছে।

ভেতরের রোহিঙ্গারা কী বলছে

রোহিঙ্গারা মনে করে ক্যাম্পে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে গণমাধ্যমে যা বলা হয় ভেতরের পরিস্থিতির সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। বালুখালি ক্যাম্পের এক সূত্র এ সংখ্যাকে নগণ্য উল্লেখ করে বলেন, এ পরিমাণ সদস্য কমিটির মধ্যে রয়েছে বললেও ঠিক হতো। আরসা, আরএসওসহ যত ধরনের সংগঠন আছে তাদের সব  মিলিয়ে কয়েক হাজারের বেশি সক্রিয় কর্মী রয়েছে। খোদ আরসারই সংগঠন কাঠামো অনেক বিস্তৃত। ক্যাম্পের প্রতিটা এলাকার খবর তাদের কাছে আছে। সম্প্রতি হওয়া একটা অপহরণ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়া যায়। কারণ, রাতের বেলা সে তার নিজের বাসা থেকে অন্য কোনও বাসায় খেতে যাবে এবং কখন সে সাধারণত যায় সবই তাদের জানা ছিল। নেতারা এলাকা বদলে থাকে সেটাও তাদের নেটওয়ার্কে ধরা পড়ে। বালুখালি ক্যাম্পের এক রোহিঙ্গা শিক্ষক মনে করেন, ক্যাম্প আরও নিরাপদ করা জরুরি। তিনি বলেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে নাম উল্লেখ করে কথা বলতে ভয় পাই। যদি ক্যাম্পে নানা ধরনের হয়রানি না থাকতো, ভয়ভীতি না থাকতো তাহলে নিজেদের অধিকারের কথা আমরা বলতে পারতাম। ছোট ছোট এত দল তৈরি হয়েছে, এখন কে কাকে বিশ্বাস করবে সেটাই বুঝতে পারে না। রোহিঙ্গারা যাতে সংঘবদ্ধ হয়ে নিজের অধিকারের কথা বলতে না পারে সেজন্য সুযোগ পেলেই তাদের নেতাদের টার্গেট করে হত্যা করা হচ্ছে। তবে ভয়াবহ হলো, কিছু মানুষ দলবদ্ধ হয়ে ক্ষমতা প্রকাশের হার আগের চেয়ে বেশি। তাদের কেউ মনিটরিংয়ে রাখছে না।

নিয়ন্ত্রণ কী সম্ভব?

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সূত্রগুলো বলছে, এসব গ্রুপের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার, নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি এসব নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। জেলা পুলিশ ও এপিবিএনের তথ্যমতে, কক্সবাজারের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২০১৭ সাল থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৮৮ জন নিহত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশই খুন হয়েছেন আরসার হাতে। এখন যেসব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এগুলো বেশি ঘটছে। ক্যাম্প তদারকি করেন যারা এমন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধিপত্যের ধরন লক্ষ করলেও বোঝা যায় নিয়ন্ত্রণ কেন সম্ভব নয়। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোয় যে একাধিক সশস্ত্রগোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে তা এখন দৃশ্যমান সত্য। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার শামসুদ্দৌজা মনে করেন, আগের তুলনায় এখন সহিংসতা কম। তিনি বলেন, গত কয়েক মাস ধরে হত্যা, অপহরণ বন্ধ আছে। তবে সম্প্রতি উখিয়াও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার পাশাপাশি খাদ্য বরাদ্দ কমিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘ। এ কারণে অর্থ সংকটে পড়েছেন রোহিঙ্গারা। চলতি বছরের মার্চে রোহিঙ্গাদের জনপ্রতি মাসিক বরাদ্দ ১২ ডলার থেকে কমিয়ে ১০ ডলার করা হয়। সর্বশেষ গত ১ জুন থেকে ওই বরাদ্দ আরও কমিয়ে আট ডলার করা হয়েছে। এ কারণে ক্যাম্পে পুষ্টি, স্বাস্থ্যসহ জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেখা দিয়েছে নানা শঙ্কা। অর্থের জোগান দিতে কেউ কেউ অপরাধে জড়াচ্ছেন।

১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন এপিবিএন অধিনায়ক অ্যাডিশনাল ডিআইজি সৈয়দ হারুন অর রশিদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন কারণে ক্যাম্পগুলোতে অস্থির পরিবেশ সৃষ্টি করছে আরসা। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কারণে আরসার সদস্যরা এখন চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। প্রকাশ্যে অপরাধমূলক কার্যক্রম অনেকাংশেই কমেছে। এছাড়া, বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে রাজনৈতিক সহিংসতার বিষয়ে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।