তৎকালীন ডিজিএফআইয়ের প্রভাবশালী দুই কর্তাব্যক্তি ব্রিগেডিয়ার চৌধুরী মো. ফজলুল বারী ও এটিএম আমীনের নাম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে ডিজিএফআইয়ের সবাইকে অত্যাচার করেছে, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম আর প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান সেই তাদের দ্বারা লালিত-পালিত। তাদের চোখের তারা, চোখের আলো। না হলে এই ডিজিএফআই যাদের অত্যাচার করলো তাদের সঙ্গে এত সখ্যতা কেন?
ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ডেইলি স্টার একেবারে আকাশের তারা, দিনের বেলায়ও দেখা যায়। আরকেটির নাম হলো প্রথম আলো। মানে আলো ফুটে যায়। কিন্তু তাদের কাজ হলো অন্ধকারের কাজ।
সম্প্রতি ডেইলি স্টার সম্পাদকের টকশোতে দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, কিছু দিন আগে একজন সম্পাদক মহোদয় সেখানে গেছেন। সেখানে একজনের উত্তরে বলতে বাধ্য হয়েছেন আমাকে দুর্নীতিবাজ বানানোর জন্য তার পত্রিকা দিনরাত যত লেখা লিখেছে- এই লেখা নাকি ডিজিএফআই তাকে সাপ্লাই দিয়েছে। আমার প্রশ্ন এখানে- এই লেখাগুলো যে ছাপানো হয়েছে সেখানে তো সূত্র উল্লেখ নেই। মানুষ তথ্য যদি পায়, তাহলে সূত্র লিখে দেয় যে এই সূত্র থেকে আমি তথ্য পেয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা পড়েন না উল্লেখ করে বলেন, দুটি পত্রিকা ২০টা বছর আমি বলতে পারি অনবরত আমার বিরুদ্ধে লিখে যাচ্ছে। এজন্য আমি কারাগার থেকে বের হওয়ার পর এই পত্রিকা দুটি পড়ি না। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তো পড়িই না। কারণ জানি এরা ভালো কথা লিখলেও শেষ সময় একটা খোঁচা দেবে। আর এই খোঁচা খেয়ে আমি হয়তো আমার আত্মবিশ্বাস হারাবো। কাজেই দরকারটা কি আমার পড়ার। কারণ আমি তো জানি তারা কী লিখবে। আমার বিরুদ্ধে লিখবে।
ওয়ান ইলেভেন প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ১/১১’র পর ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসলো। আমরা ভাবলাম নির্বাচন দেবে। কিন্তু দেখি নির্বাচন নয় তারা ক্ষমতায় গিয়ে পার্লামেন্টই বসার ষড়যন্ত্র করছে। সেই ষড়যন্ত্রের প্রথম আঘাত আমার ওপরে। আমার বিরুদ্ধে একটার পর একটা মামলা। বিএনপির আমলে এক ডজন মিথ্যা মামলা দিয়ে রেখেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার ৫/৬টা মিথ্যা মামলা। মামলা দেওয়া ও গ্রেফতারের আগে ওই পত্রিকা আমাকে দুর্নীতিবাজ বানানোর জন্য মিথ্যা কথা লিখে গেছে। অসত্য তথ্য দিয়ে গেছে। সেই অসত্য তথ্যের সাফ্লাইয়ার জিডিএফআইয়ের দুই অফিসার বিগেডিয়ার আমিন আর ব্রিগ্রেডিয়ার বারী। তাদের অত্যাচারে এদেশের শিক্ষক, ছাত্র, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে কেউই রেহাই পায়নি। প্রত্যেকের ওপর এরা অত্যাচার করেছে। যখন যাকে খুশি ধরো, জেলে পুরো। যাকে খুশি অত্যাচার করো নির্যাতন করো। যারা এভাবে অত্যাচার করেছে তাদের সঙ্গে কি এমন সখ্যতা ওই এডিটরের ছিল আমি সেটাই প্রশ্ন করি। মাহফুজ আনাম সম্পাদক তার কাছে আমার প্রশ্ন- সে কি তার উত্তর দিতে পারবে বা প্রথম আলোর মতিউর রহমান কি উত্তর দিতে পারবে। যে এত সখ্যতা কেন?
দুই সম্পাদকের নাম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা ওই সময় গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করার জন্য বা রাজনীতি থেকে চিরতরে বিদায় দেওয়া। নির্ভীক সাংবাদিকতার নামে তারা ডিজিএফআইয়ের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছে। জিডিএফেইয়ের এজেন্ট হিসেবে তারা এসব তথ্য দিয়েছে। অথবা তাদের পে-রোলে ছিল। তাদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে করেছে অথবা তাদের দূতিয়ালি করেছে। অবশ্যই ষড়যন্ত্রেই তো লিপ্ত ছিল। ষড়যন্ত্রে লিপ্ত না থাকলে এ ধরনের মিথ্য অসত্য তথ্য তারা ছাপাবে কেন?
তিনি আরও বলেন, এরা চায় অসাংবিধানিকভাবে কেউ ক্ষমতায় আসুক। অসাংবাধানিকভাবে যেন এদেশ চলে তাহলে তাদের গুরুত্ব বাড়ে। গণতান্ত্রিক পরিবেশে তাদের ধমফুটে, তারা গণতান্ত্রিক পরিবেশ চায় না। রাজনীতি করবার যদি ইচ্ছা থাকে, ক্ষমতায় যাওয়ার যদি ইচ্ছা থাকে তাহলে দল গঠন করে রাস্তায় নামুন। আমরা রাস্তায় নেমেছি, পুলিশের বাড়ি খেয়েছি, বার বার কারাবরণ করেছি, নির্যাতিত হয়েছি, জনগণের কথা বার বার বলেছি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরেছি। মৃত্যুকে মোকাবিলা করে রাজনীতি করেছি। সর্বদা ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থেকেছি। রাজনীতি যাওয়া আর ক্ষমতায় যাওয়ার যদি এত শখ থাকে তাহলে ভোট নিয়ে আসুক।
ড. ইউনূসের নাম উল্লেখ না করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এই দুই সম্পাদকের স্বপ্নের সঙ্গে আবার আরেক জন জড়িত। যিনি দল করার চেষ্টা করেন। ঘোষণা দিলেন তত্ত্বাবধায়াক সরকারকে ডাবল এ প্লাস দেওয়া হবে। আর তার দেওয়া তালিকা নিয়ে একজন সম্পাদক নেমে পড়লো দলের লোক গোছাতে কিন্তু কেউ আসে না, সাড়া দেয় না। সেই দল আর কেউ করতে পারলো না। একটা দল করার যোগ্যতা নেই।
ইউনূস প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, একটা ব্যাংকের এমডি পদ হারানোর ক্ষোভ পড়লো পদ্মা ব্রিজের ওপর। মামলায় হেরে গেল আর সব দোষ পড়লো শেখ হাসিনার ওপর। পদ হারানোর ক্ষোভে জ্বললো আমার বাংলাদেশ। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেললো। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সব থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যে এলাকাটা সেই দক্ষিণাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ে খেললো। তাহলে এতবড় আন্তর্জাতিক খেতাবের মূল্য আছে কি। যিনি নোবেল প্রাইজ পেয়ে এক এমডির পদ ছাড়তে পারলেন না, ওখানে মধুটা কোথায়।
তিনি বলেন, আমেরিকা তার বন্ধু, তাদেরকে বলে পদ্মা ব্রিজের টাকা বিশ্বব্যাংক বন্ধ করে দিলো একটা কারণে। আর বললো দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়েছি কোথায় ষড়যন্ত্র জানতে চাই। আমি বার বার বলেছি দুর্নীতির প্রমাণ দিতে হবে। আমি, আমার পরিবার বা আমার মন্ত্রিসভার বা সচিবদেরা যে দুর্নীতি করেছে, আমি তার প্রমাণ চাই। কোনও প্রমাণ তারা দেখাতে পারেননি। এখনো তারা পারেননি। কানাডার কোর্টে মামলা আর সেই কানাডা প্রমাণ চেয়েছে সেটা তারা দেখাতে পারেনি। এটা আর তাকে নিয়ে ওয়ান ইলেভেনে দল করার প্রচেষ্টা সেখানেও ব্যর্থ। জনগণ তাকে গ্রহণ করেনি। বরং তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে এদের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। এরা এখনো ভাবে কোনওমতে যদি একটু গণতন্ত্রকে ধরাসাই করা যায়। আর অগণতান্ত্রিক পন্থায় যদি কিছু আসে, তাদের কপালটা খুলবে। আল্লাহর রহমতে তা আর হবে না। বাংলাদেশের মানুষ এখন সচেতন। দেশবাসী সচেতন। যে যত ষড়যন্ত্র করুক আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ রোধ করতে পারবে না। এ বিশ্বাস আমাদেরে আছে।
বেসরকারি টেলিভিশনে টাক শো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা কথা বলতে খুব পছন্দ করি। আমরা ৩২টা টেলিভিশনের অনুমতি দিয়েছি। যে টেলিভিশনগুলো চালু আছে সেখানে টকশো- টক-মিষ্টি-ঝাল কথা বলতে বলতে সেগুলো টকই হয়ে যায়। সমানে কথা বলে যাচ্ছেন। তারপর কি বলবেন কথা বলার স্বাধীনতা নাই। স্বাধীনতাই যদি না থাকলো তাহলে এত কথা বললো কি করে। এত কথা এলো কীভাবে। কাউকে তো বাধা দেওয়া হচ্ছে না। ইচ্ছামতো মনের মাধুরী মিশিয়ে যেভাবেই হোক কথা বলেই যাচ্ছেন। আলোচনা করেই যাচ্ছেন। বক্তারা নিজেরাই হয়তো শোনেন না তারা কী বললেন এর মধ্যে কতটা সত্যতা আছে। আমরা এই কথা বলার সুযোগটা করে দিয়েছি। বলেন, যে যা পারেন বলে যান। মনের যত তাপ উত্তাপ সব বের করে বলে যান। কিন্তু মনে রাখবেন, গণমাধ্যমকে আমরা কোনও মতেই নিয়ন্ত্রণ করি না।
/ইএইচএস/এএইচ/