‘বাস্কেট কেস’ থেকে বাংলাদেশের ‘এশিয়ান টাইগার’ হয়ে ওঠার কাহিনি

বিখ্যাত মার্কিন কূটনীতিবিদ হেনরি কিসিঞ্জার এক সময় বাংলাদেশকে ‘বটমলেস বাস্কেট’ বা তলাবিহীন ঝুড়ি-র সঙ্গে তুলনা করেছিলেন এমনটাই প্রায় সবার জানা। যদিও তিনি আসলে যে শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন সেটা হল ‘বাস্কেট কেস’ – আর সেটা ছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা।  

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের পুরনো ট্রান্সক্রিপ্ট ঘেঁটে কোনও কোনও গবেষক আবার জানিয়েছেন, আসলে এই ‘বাস্কেট কেস’ কথাটা প্রথম ব্যবহার করেছিলেন তখনকার একজন মার্কিন কূটনীতিবিদ ইউ অ্যালেক্সি জনসন। তিনিই প্রথম আলোচনায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গে শব্দটা ব্যবহার করেন, সেখান থেকে তা লুফে নেন হেনরি কিসিঞ্জার।

‘বাস্কেট কেস’ কথাটা আমেরিকান ইংরেজিতে একটা পরিচিত শব্দবন্ধ – যার অর্থ হলো ‘অসহায়’ এবং ‘যাকে অবশ্যই সাহায্য করতে হবে’। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যে মার্কিন সৈনিকরা হাত-পা হারিয়েছিলেন এবং বেঁচে থাকার জন্য রাষ্ট্রের সাহায্যের মুখাপেক্ষী ছিলেন তাদের প্রসঙ্গেই কথাটা প্রথম ব্যবহার করা শুরু হয়েছিল। পরে অন্য প্রেক্ষিতেও শব্দটা চালু হয়ে যায়। 

মুক্তিযুদ্ধের পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের যে আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ত্রাণের খুব দরকার ছিল, এটা অস্বীকার করার কোনও জো নেই। 

‘বাংলাদেশ : ফ্রম বাস্কেট কেস টু এশিয়ান টাইগার’

কিন্তু আজ অর্ধশতাব্দী পর সেই বাংলাদেশের ছবিটা সম্পূর্ণ আলাদা, জীবনযাপনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা শুধু স্বনির্ভরতাই অর্জন করেনি – এশিয়ার অর্থনীতিতে উদীয়মান এক শক্তি হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। প্রবৃদ্ধির হার ও পার ক্যাপিটা ইনকামে (মাথাপিছু গড় আয়) তারা আজ বহু শক্তিশালী অর্থনীতিকেও অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে – এবং এই সাফল্যের সিংহভাগই অর্জিত হয়েছে বিগত দেড় দশকে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে। 

কীভাবে ‘বাস্কেট কেস’ থেকে বাংলাদেশ আজ ‘এশিয়ান টাইগারে’ রূপান্তরিত হলো—লন্ডনভিত্তিক লেখক ও গবেষক স্যামুয়েল রিচার্ড তা নিয়েই লিখেছেন তার নতুন বই ‘বাংলাদেশ : ফ্রম বাস্কেট কেস টু এশিয়ান টাইগার’। বৃহস্পতিবার (১৬ নভেম্বর) সন্ধ্যায় দিল্লির বাংলাদেশ দূতাবাস প্রাঙ্গণে এক অনুষ্ঠান ও আলোচনাচক্রে সেই বইটির আনুষ্ঠানিকভাবে মোড়ক উন্মোচন করা হলো। 

এই অনুষ্ঠানেই ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব, ঢাকায় ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার এবং সদ্যসমাপ্ত জি-টোয়েন্টি সামিটে ভারতের প্রধান কোঅর্ডিনেটর হর্ষবর্ধন শ্রিংলা মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন মানেই ভারতের উন্নয়ন। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি মানে ভারতেরও প্রবৃদ্ধি। এবং উল্টোটাও।’ সহযোগী হিসেবে এই দুই দেশ যে বিগত কয়েক বছরে কত কিছু অর্জন করেছে, অনেকগুলো দৃষ্টান্ত দিয়ে তা তিনি তুলে ধরেন।

আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও ঢাকায় ভারতের প্রাক্তন হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা

দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মহম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান তার ভাষণে শেখ হাসিনা সরকারের বহু সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। বুধবারই লন্ডনে এক আলোচনাসভায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর যে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ককে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ‘মডেল সম্পর্ক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, সে কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি।

দিল্লির থিংক ট্যাংক রিসার্চ অ্যান্ড ইনফর্মেশন সিস্টেমসের অধ্যাপক ড. প্রবীর দে বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক যে এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে তার একটা প্রধান কারণ হলো ‘কানেক্টিভিটি’। রেল, সড়ক, নদী, সমুদ্র ও আকাশপথে দুই দেশের সংযোগ বৃদ্ধির কারণেই ভারত ও বাংলাদেশ একে অপরকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে চিনতে পেরেছে বলে তিনি জানান।

আই আই এম রোহটাকের ডিরেক্টর ও নামী ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ ধীরাজ শর্মা মন্তব্য করেন, যে কোনও বড় সাফল্য কিন্তু এমনি এমনি আসে না– তার পেছনে অনেকগুলো ‘অ্যান্টিসিডেন্ট’ ও ‘ক্যাটালিস্ট’ থাকে। তার অভিমত, বাংলাদেশ আজ যে অসাধারণ আর্থসামাজিক উন্নয়ন অর্জন করেছে, তার পেছনেও সবচেয়ে বড় ক্যাটালিস্ট হলো ‘শেখ হাসিনার সাহসী ও কুশলী নেতৃত্ব’। 

আলোচনায় মডারেট করেন বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (কনসুলার) মহ. সেলিম জাহাঙ্গীর। স্যামুয়েল রিচার্ডের বইটি কেন বাংলাদেশকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তিনি সংক্ষেপে সেই বক্তব্য তুলে ধরেন। 

এই অনুষ্ঠানে দিল্লির সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ও কূটনৈতিক মহলের বহু প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। একটা সময় হর্ষবর্ধন শ্রিংলা তো বলেই ফেললেন, ‘আমি এখানে এত সাংবাদিক বন্ধুকে দেখতে পাচ্ছি, আমাদের ফরেন মিনিস্ট্রির ব্রিফিংয়েও অতজনকে কখনও পাই না!’

ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী বাংলাদেশে পরবর্তী নির্বাচন হতে আর ঠিক ৫০ দিন বাকি আছে। এই নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেশী ভারতেও আগ্রহ বা কৌতূহল প্রবল – ঠিক তার আগে স্যামুয়েল রিচার্ডের এই প্রামাণ্য গ্রন্থটি ভারত-সহ আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশকে যে নতুন করে চেনাবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।