চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই হাত বাড়ালেই পাওয়া যায় অ্যান্টিবায়োটিক। উন্নত বিশ্বে এমন দৃশ্য কল্পনাও করা যায় না। আমাদের দেশের ফার্মেসিগুলোতে কোনও ফার্মাসিস্ট নেই, আর বিক্রয়কর্মীরা এসবের কিছু জানেন না। যে কেউ চাইলেই যে কোনো ওষুধ কিনতে পারেন। এমনকি মৃত্যুর ওষুধও পাওয়া যায় অনায়াসেই।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মন্তব্য,দেশে আলু-পটলের দোকান আর ওষুধের দোকানের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। নীতিমালা, নির্দেশনার বাস্তবায়ন না হলে ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রি ঠেকানো যাবে না।
রাজধানীর মগবাজার, শান্তিনগরসহ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি ফার্মেসি ঘুরে দেখা গেছে,প্রেসক্রিপশন ছাড়াই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক।
ফার্মেসিতে কথা বলে জানা গেছে, সিপ্রোফ্লোক্সাসিন,সিপ্রোসিন,সেফ-থ্রি,লিবেক,ফিউরোক্ল্যাভ, ফ্লুক্লোক্স, অ্যামোক্সিসিলিন জাতীয় অ্যান্টিবায়োটিকগুলো বেশি বিক্রি হচ্ছে। বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রেসক্রিপশন না থাকলেও তারা অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করে থাকেন। অনেক সময় প্রেসক্রিপশনে লেখা ওষুধ তারা বদলেও দিয়ে থাকেন।
বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়। রোগীর বয়স, উচ্চতা ও ওজন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট নিয়মে, সঠিক মাত্রায় এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে শেষ করতে হয়।অথচ আমাদের দেশে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের নির্দিষ্ট নিয়ম মানা হয় না। এর ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে।
দেদারসে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি প্রসঙ্গে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক ড. মাহমুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পৃথিবীজুড়ে ফার্মাকোলজিক্যাল গাইডলাইন আছে। বিভিন্ন দেশের নিজস্ব গাইডলাইনও আছে। বাংলাদেশেও কিছু গাইডলাইন আছে,সেটাও ফলো করা যায়।আবার আন্তর্জাতিক গাইডলাইনও ফলো করা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, শুধু গাইডলাইন করলেই হবে না,আমাদের দেশে যে কোনও ওষুধের দোকানে যে কোনও ওষুধ কেনা যাচ্ছে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক না দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তা কেউ মানছে না। এর কারণ হলো, আমাদের দেশে সবাই জানে,নিয়মের বা গাইডলাইনের কোনও বাস্তবায়ন নেই।’
তিনি বলেন, ‘অ্যানিবডি ক্যান বাই অ্যানি মেডিসিন ফ্রম ফার্মেসি (যে কেউ যে কোনও ওষুধের দোকান থেকে যে কোনও ওষুধ কিনতে পারে)। চাইলে মরে যাওয়ার ওষুধও পাওয়া যায়। কারণ এখানে দেখভাল বা নিয়ন্ত্রণের কেউ নেই। এখন ওষুধের দোকান আর আলুর দোকান এক হয়ে গেছে। ওষুধ আর আলু একই সঙ্গে কেনা যাচ্ছে। এসব কারণেই সমস্যাটা প্রকট আকার ধারণ করেছে। গাইডলাইন থেকে যদি বাস্তবায়ন না হয়,তাহলে বিষয়টি শুধুই থিওরিটিক্যাল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।’
কোনও চিকিৎসক কোনও রোগের জন্য কী শর্ত মেনে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দিতে পারবেন,সে বিষয়ে নির্দেশনার বাস্তবায়ন না হলে এ ওষুধ বিক্রি ঠেকানো যাবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা.তানভীর আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত রোগীরা ফার্মেসিতে থাকা লোকটিকেই ডাক্তার মনে করেন। অসুখের কথা বলে অ্যান্টিবায়োটিক পেয়ে যাচ্ছেন।সাময়িকভাবে তার অসুখটি সেরে যাচ্ছে। তাহলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে তারা কেনও যাবেন। কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে তা তাদের জানার কথা নয়।তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে।’
ডা.তানভীর বলেন,‘একেক রকম অসুখের জন্য একেক রকম অ্যান্টিবায়োটিক আছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ তো তা জানে না। আবার একই অ্যান্টিবায়োটিক ডায়াবেটিস আক্রান্ত,নারী-পুরুষ,বয়স্ক, প্রেসারে আক্রান্ত,হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর জন্য ভিন্ন ভিন্নভাবে খেতে হবে,এখানে অনেক বিষয় জড়িত।এসব কারণেই বেশিরভাগ সময় অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না।’
অপরদিকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা.তাজুল ইসলাম বাংলা টিবিউনেক বলেন,‘অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার আমাদের দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়।ফলে অ্যান্টিবায়োটিক একসময় আর কাজ করে না। অ্যান্টিবায়োটিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও সাধারণ ওষুধের চেয়ে বেশি। এটা শরীরের সব অর্গানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।পৃথিবীর কোনও দেশেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি হয় না।আমাদের দেশেও এ বিষয়ে নির্দেশনার বাস্তবায়ন থাকতে হবে।’
/এজে/এপিএইচ/