রান্নাঘর থেকে নয়, অন্য ঘরে জমা গ্যাস থেকেই আগুন!

সুমাইয়া আক্তাররান্নাঘর থেকে নয়, ঘরের অন্য কোথাও গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে উত্তরার বাসাটিতে আগুন লেগেছিল বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন বিস্ফোরণে মারাত্মকভাবে আহত গৃহকর্ত্রী সুমাইয়া আক্তারের স্বজনরা।
ওই গ্যাসের আগুনে পুড়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন সুমাইয়ার স্বামী ও দুই সন্তান। সুমাইয়া মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন।
সুমাইয়া আক্তারের বড় জা ফরিদা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এতোদিনতো কথা বলেনি সুমাইয়া। আজ সে জানালো, রান্নাঘর থেকে আগুন লাগেনি, অন্য ঘর থেকে আগুন লেগেছে।’
আইসিইউয়ের বিছানায় শোয়া সুমাইয়া মৃদুস্বরে স্বজন ফরিদা জামানকে বলেন, ‘আমি দরজা খুলে চিৎকার করে বলি, আমাকে একটি চাদর দেন, আমার কাপড় পুড়ে গেছে। তখন চারতলা, তিনতলার বাসার দরোজা খুললো, কিন্তু তারপরেই আবার ঠাস করে বন্ধ হয়ে গেল। কেউ আমাকে সাহায্য করলো না। শেষে নিচে গিয়ে একটা ছালা পেলাম, সেটাই গায়ে জড়ালাম। কেউ এগিয়ে এলো না।’
সুমাইয়া আরও বলেন, ‘আমি ছিলাম রান্না ঘরে, ছেলের বাবা আমার ছোট ছেলে ছিল ডাইনিংরুমে, সেখানেই ছেলের বাবা ফ্যান ছাড়লে বিকট শব্দ হয় আর আগুন লেগে যায় ঘরে। ডাইনিং রুমে পাতা খাটে ছিল মেজ ছেলেটা। বড় ছেলেটা ছিল তার ঘরে। কিন্তু আগুন ছিল ডাইনিং রুমে আর বড় ছেলের রুমে। রান্না ঘরে আগুন জ্বালানো হলেও সেখানে আগুন ছিল না।’
শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া সুমাইয়া গত শুক্রবার থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রথমে তাকে এইচডিইউতে রাখা হলেও পরে তার অবস্থার অবনতি হলে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।

মঙ্গলবার আইসিইউয়ের বাইরে কথা হয় সুমাইয়ার সেজ ভাই আবুল হাসনাত খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সেদিন ঘরে একটা বিকট গন্ধ পাওয়াতে আমার বোনের স্বামী শাহীন মোমবাতি জ্বালিয়ে রাতের বেলাইতেই দেখতে চেয়েছেন কোথা থেকে গন্ধটা আসতেছে। রান্নাঘর, ঘরের কোনায় কোনায় দেখেছেন, কিন্তু কিছুই পাননি। ফজরের নামাজের পরে রান্নাঘরে গিয়ে পানি গরম দেন। তখনও গন্ধটা ছিল। তখন শাহীন ভেবেছেন ফ্যান ছেড়ে দিলেই হয়তো গন্ধটা চলে যাবে। ফ্যান ছাড়তেই পুরো ঘরে আগুন লেগে যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সবাই বলছে, রান্নাঘরের চুলার গ্যাস লাইন লিক থাকায় আগুন লেগেছে। কিন্তু রান্নাঘরের চেয়ে বাসার অন্য রুমগুলো পুড়েছে বেশি। রান্নাঘরের তেমন কিছু হয়নি। গ্যাস লাইনের অন্য কোথাও লিকেজ ছিল বলেই এমনটা হয়েছে।’

সুমাইয়ার জা ফরিদা বেগম বলেন, ‘ওরা চার ভাই, কোনও বোন নেই। আমরা সবাই মিলে খুব সুখে ছিলাম। আগে ওরা উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরে থাকতো, কিন্তু বাচ্চাদের স্কুলের সুবিধার জন্য নতুন বাসা নেয়।
শুক্রবার ভোর সাড়ে ছয়টা সাতটার দিকে একটা ফোন আসে আমার মোবাইলে। বলে, ১৩ নম্বরে আপনার আত্মীয় যারা ছিল তারা সবাই পুড়ে গেছে, তারা এখন ঢাকা মেডিক্যালে। কোনওরকমে এখানে এসে দেখি, পাঁচজনকে শুইয়ে রেখেছে। ডাক্তাররা কাকে রেখে কাকে ধরবে, ছোট ছেলেটা কাঁদতেছে… সে কি দৃশ্য!’

তিনি বলেন, ‘আমি আসার সঙ্গে সঙ্গেই আমার জা (সুমাইয়া আক্তার) বলতেছিল, ওই বিল্ডিংয়ের কেউ সহযোগিতা করে নাই। সকাল বেলায় চুলা ধরাইলাম তখনও ভালোই ছিল। কিন্তু আপনার দেবর ফ্যান ছাড়লো এরপরই একটা শব্দ শুনলাম আর দেখলাম আগুন। তখন দরজা খুলে দৌড়ালাম, কিন্তু আমাকে দেখে সবাই দরোজা খুলে আবার বন্ধ করে দিল। আর কিছু বলতে পারবো না। সেদিন বিকাল বেলাতেই বড় ছেলে শালীন মারা গেল, ছোট ছেলেটা মারা গেল সন্ধ্যার পরে। বর্তমানে মেজ ছেলেটা আছে একটি বেসরকারি হাসপাতালে।’

মামলা করবেন কিনা জানতে চাইলে ফরিদা বলেন, ‘আমরা এগুলো নিয়ে এখনও ভাবছি না। আগে সুরাইয়া সুস্থ হয়ে উঠুক তারপর দেখা যাবে। আমাদের চোখের পানি পড়তে পড়তে এখন শুকিয়ে গেছে।’

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ৯০ শতাংশ পুড়ে গেলে একজন রোগীকে আমরা খুবই ক্রিটিক্যাল রোগী হিসেবে দেখি। সাধারণত এ ধরনের রোগী বাঁচে না। তারপরও আমরা তাকে সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছি।

সুমাইয়াকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে মঙ্গলবার রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করেছেন তার স্বজনেরা।

ফরিদা বলেন, ‘ঘটনার পর থেকে ওই বাড়িওয়ালা কোনও খবর নেননি। পুলিশ সেখানে যাচ্ছে, তদন্ত করছে, কিন্তু আমরা কাউকে কিছু বলিনি এখনও। তবে এটা আমরা দেখবো। কেন সেদিন ওদেরকে কেউ সাহায্য করলো না, মানুষ কি এতোটাই রোবট হয়ে গেছে এখন!’

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার উত্তরার ১৩ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর সড়কের ৮ নম্বর বাড়ির সপ্তমতলার ফ্ল্যাটে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তবে ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর আগেই শেষ হয়ে যায় পরিবারটি। আগুনে চারজনের শ্বাসনালী পুড়ে যায়। পরিবারের বড় ছেলে শালীন ও ছোট ছেলে জায়ান চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সেদিনই।

তার পরদিন মারা যান গৃহকর্তা প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ। জানা যায়, গত ২০ ফেব্রুয়ারি পরিবারটি নতুন ওই বাসায় ওঠে।

এজে/