বর্জন ও প্রতিহতের ঘোষণার মধ্যে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন আয়োজনের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, ‘নির্বাচনের এই যাত্রা কুসুমাস্তীর্ণ নয়। জনগণ ও বহির্বিশ্বের কাছে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হতে হবে।’
রবিবার (৩১ ডিসেম্বর) বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রশিক্ষণ উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন সিইসি।
সেই সঙ্গে ভোটের দিন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুল তথ্যের ছড়াছড়ির বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের সাবধানতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়ে সিইসি বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটা অংশ নির্বাচন বর্জন করছে। সাধারণত নির্বাচন খুব উৎসবমুখর পরিবেশে হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে যখন নির্বাচন বর্জন করা হয়েছে, তখন সহিংসতা হয়েছে। সেটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনেও কিছু বিতর্ক হয়েছে, যদিও সার্বিকভাবে অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। তাই সেসময় নির্বাচন নিয়ে কোনও চ্যালেঞ্জ ছিল না।’
এবারের সংসদ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘নির্বাচন আমাদের দ্বারপ্রান্তে। কুসুমাস্তীর্ণ পথে আমরা এগোচ্ছি না। কিছু দিন ধরে বিতর্ক চলছে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে। বিতর্কের মধ্যে আমাদের দেশে নির্বাচন প্রশ্নে বাগবিতণ্ডা হচ্ছে, সহিংসতাও হয়েছে। আগামী নির্বাচনটায় আমাদের বেশি মনোযোগী হতে হবে আরেকটি কারণে, রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা বাগবিতণ্ডা আছে।’
দলীয় সরকারের অধীনে ভালো নির্বাচনের প্রমাণ দেওয়ারও তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনটা যেকোনও মূল্যে আমাদের প্রমাণ করতে হবে—একটা সরকার তার দায়িত্ব পালনের সময় নির্বাচন কমিশন ভালো নির্বাচনের আয়োজন করতে পারে। ইসিকে বলা হয় ইলেকশন ম্যানেজমেন্ট বডি। সরকার বাধ্য ইসিকে সহায়তা করতে। সরকারের সহায়তা ছাড়া আমরাও নির্বাচন করতে পারি না।’
সিইসি জানান, ভোটে প্রায় ১৬ লাখ লোক দায়িত্ব পালন করে। প্রায় ৮ লাখ সরাসরি ভোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাকি ৮ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভোটের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে কাজ করে।
ভোটের দিনের নানা ধরনের অসদুপায় অবলম্বনের কথা তুলে ধরে সিইসি কর্মকর্তাদের দায়িত্বের বিষয়ে সজাগ থাকার নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ব্যালট বাক্সে সিল মেরে ভরে দেওয়া, কেন্দ্র দখল, কেন্দ্রের ভেতরে পেশিশক্তির প্রভাব পরিবেশ নষ্ট করে। কেন্দ্রের ভেতরে অরাজকতা হলে ভোটাররা কেন্দ্র থেকে ফিরে যাবে। নিরপেক্ষ ভোটার হলে তারা ভোটটাকে প্রত্যাখ্যান করে চলে যাবে।
ভোট নিয়ে অনাচার চোখে পড়লে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তাৎক্ষণিক তৎপরতার মাধ্যমে জনগণের কাছে আস্থা গড়ে তুলতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সিইসি জানান, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা সচরাচর ভোটকেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করবেন না। প্রিজাইডিং অফিসার তাদের তলব করতে পারেন। কেন্দ্রের দায়িত্ব প্রিজাইডিং অফিসারের, সেদিন ভোটকেন্দ্রের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা তারা। দেখা গেলো শৃঙ্খলা রাখতে পারছেন না, কেন্দ্র দখল করার উপক্রম হয়েছে; তখন তিনি ডাকবেন। ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশকে ডাকবেন। এছাড়া অননুমোদিত কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেবেন না, বাইরে থেকেও পর্যবেক্ষণ করবেন।’
গণমাধ্যম ও অবজারভারদের ভূমিকা তুলে ধরে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে দৃশ্যমানের মধ্য দিয়ে। সেক্ষেত্রে গণমাধ্যম দৃশ্য ফুটিয়ে তুলতে পারে। অনুমোদিত ব্যক্তিরা শুধু গোপনকক্ষে প্রবেশ করবেন না। কেন্দ্রে বিচরণ করে ছবি তুলে তাৎক্ষণিকভাবে সব প্রচার করতে পারবেন। জনগণ যদি দেখেন ভেতরের পরিবেশ স্বচ্ছ, তাহলে তারা বেরিয়ে এসে বলবেন—সুন্দরভাবে ভোট দিয়েছি। তাহলে ভোটটা স্বচ্ছ হবে, গ্রহণযোগ্য হবে।’
তিনি জানান, ‘নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে—এটা জনগণ বিশ্বাস করলেই বলা যাবে ভালো ভোট হয়েছে। মানুষ বেরিয়ে এসে যদি বলে ভেতরে পরিবেশই নাই, কেন্দ্রের ভেতরে মাস্তান... ভোটাররাই প্রকৃত সত্য তুলে ধরবেন।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে ৯০ শতাংশই বানোয়াট তথ্য দাবি করে তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়াতে অপপ্রচার হতে পারে। মিস ইনফরমেশনটাকে রোধ করতে হবে, মিস ইনফরমেশন ইজ প্রবলেম। এটা আমাদের বড় ধরনের ঝামেলা। সঙ্গে সঙ্গে এটাকে কাউন্টার করা যায় কিনা দেখতে হবে। এটা আসলেই ঘটছে কিনা বা পাতানো কিনা। প্রথম প্রথম ইউটিউবে যা দেখতাম, অহির মতো বিশ্বাস করতাম; বোধহয় সত্য। এখন বুঝতে পারি (ভুল তথ্যের ছড়াছড়ি) এসব পাতানো। এখন দেখি ৯০ শতাংশই বানোয়াট।’
অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘শুধু আমাদের দৃষ্টিতে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করলে হবে না। আমাদের দিকে সমগ্র বিশ্ব তাকিয়ে আছে। এই নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য না করতে পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বাংলাদেশে সব বিষয়- বিশেষ করে আর্থিক, সামাজিক, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব কিছু থমকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বাংলাদেশ হয়তো বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।’
প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইসি সচিব মো. জাহাংগীর আলম। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরী, ইটিআই মহাপরিচালক এসএম আসাদুজ্জামানসহ ইসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।