সারা দেশে একযোগে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলছে। রবিবার (৭ জানুয়ারি) সকাল ৮টায় ভোট নেওয়া শুরু হয়েছে। বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শীতের সকালে ভোটগ্রহণ শুরু হলেও কেন্দ্রগুলোতে ভোটারের উপস্থিতি কম। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শীতের সকালে মানুষজন ঘুম থেকে উঠতে এমনিতেই দেরি করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিতিও বাড়বে।
সকালে ভোটগ্রহণ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা সিটি কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ভোট দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সবাইকে ভোটকেন্দ্রে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘আমাদের সামনে আরও কাজ আছে, এগুলো সম্পন্ন করতে চাই। আমরা আশা করি, নৌকা মার্কার জয়লাভ হবে। আমরা যে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পেয়েছি আবারও আমরা জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে তা বাস্তবায়ন করতে পারবো। এ বিশ্বাস আমাদের আছে। জনগণের উপর আমার বিশ্বাস আছে।’
এদিকে মিরপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুলের ২ নম্বর ভোট কেন্দ্রে সকাল ৮টা ১৮ মিনিটেও কোনও ভোটার না আসায় প্রসাইডিং অফিসার মো. কামাল হোসেন দোতলা থেকে নিচ তলায় নেমে ভোটার এসেছেন কিনা খোঁজ নিতে আসেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই আসনে সেনাপ্রধান ভোট দিতে আসবেন। এ কারণে ব্যস্ততা যাচ্ছে।’ ঠিক এই সময়েই কেন্দ্রে আসেন প্রথম ভোটার।
জানা গেছে, মিরপুর ডিওএইচএস এলাকার ভোটাররা একটু দেরিতে ভোট দিতে আসেন। তবে আশপাশের এলাকার ভোটাররা শুরু থেকেই অল্প অল্প করে আসছেন। ফলে এই কেন্দ্রে ভোটারদের কোনও লাইন চোখে পড়েনি। পাশের সেনানিবাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও সকাল ১০টা পর্যন্ত একই চিত্র দেখা গেছে।
সকাল ৯টার দিকে ঢাকা-৯ আসনের আওতাধীন রাজধানীর মানিকনগর এলাকাতেও ভোটার উপস্থিতি কম দেখা গেছে। মানিকনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র ও মানিকনগর মডেল হাই স্কুল কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সকাল ৮টায় ভোট শুরু হলেও প্রথম এক ঘণ্টায় খুব বেশি ভোটার আসেননি। বিশেষ করে নারী ভোটারের উপস্থিতি একেবারেই কম। এই দুটি কেন্দ্রে সকাল সোয়া ৯টা পর্যন্ত ভোটারদের লাইনে দাঁড়াতে হয়নি।
এই দুই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসাররা জানান, ভোট শান্তিপূর্ণভাবে হচ্ছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটারের উপস্থিতিও বাড়ছে।
ঢাকা-৫ আসনের আওতাধীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৫ নম্বর ওয়ার্ডে শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোটকেন্দ্রেও সকাল ৯টা পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি কম দেখা গেছে। যারা আসছেন তাদের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। সরাসরি ভোট দিতে পারছেন। এসময় নৌকা, ট্রাক ও ঈগল ছাড়া আর কোনও প্রতীকের এজেন্টকে দেখা যায়নি এই ভোটকেন্দ্রটিতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরব উপস্থিতি রয়েছে।
একই আসনের যাত্রাবাড়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোটকেন্দ্রেও ভোটার উপস্থিতি কম। সকাল ৯টার দিকে দেখা গেছে, কেন্দ্রটিতে দুয়েকজন লাইনে দাঁড়িয়েছেন।
তবে দনিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোটকেন্দ্রের বাইরে নৌকা, ট্রাক, ঈগলের প্রার্থী ছাড়াও সোনালি আঁশ এবং টেলিভেশন প্রতীকের বেশ কিছু সমর্থকের দেখা গেছে। যদিও কেন্দ্রটিতে ভোটার উপস্থিতি কম। দুয়েকজন এলেও তাদরে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে হওয়ায় এই কেন্দ্রটিকে ঘিরে সেনাবাহিনী ও বিজিবিকে দহল দিতে দেখা গেছে।
এছাড়া সকাল পৌনে ১০টার দিকে ঢাকা-৫ আসনের আওতাধীন ধলপুর সিটি করপোরেশন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়েও দেখা গেছে একইচিত্র। এই কেন্দ্রটিতেও ভোটারদের কোনও লাইনে দাঁড়াতে হয়নি। এই কেন্দ্রে সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ১১০ জন ভোটার ভোট দিয়েছেন বলে জানান কেন্দ্রটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিজাইডিং অফিসার।
রাজধানীর আবুজর গিফারী কলেজ কেন্দ্রে দেখা গেছে, সেখানে সকাল থেকেই পুরুষ ভোটারদের উপস্থিতি বেশি। এই কেন্দ্রে ভোট দেওয়া শেষে আলী হোসেন নামে এক ভোটার বলেন, ‘সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে ভোট দিতে পেরেছি। দেখেন পরিবেশটাও সুন্দর। যারা সুন্দরভাবে নির্বাচনের আয়োজন করেছেন তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। ভোট দিয়ে ভালোই লাগছে।’
এদিকে রাজধানীর শান্তিনগরে হাবীবুল্লাহ বাহার ডিগ্রি কলেজ ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি সাড়ে ৮টার দিকে কেন্দ্রটিতে ভোট দেন। এই কেন্দ্রটিতেও ভোটারের তেমন উপস্থিতি চোখে পড়েনি। কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অলস সময় পার করতে দেখা গেছে। কয়েক মিনিট পর একেক জন ভোটার আসতে দেখা গেছে।
ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার গাজীউর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ভোটারের উপস্থিত কম। আশা করছি সময়ের সাথে ভোটারের সংখ্যাও বাড়বে। এ কেন্দ্রে সকাল থেকে প্রায় ৬০টি ভোট পড়েছে।’ এ কেন্দ্রে মোট ২ হাজার ১৯ জন ভোটার রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ভোটার উপস্থিতি কমের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘ভোটার উপস্থিতি কম কি বেশি, সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি এসে শুধু আমার ভোটটা এখন দিয়ে গেলাম। যদি কোনও সমস্যা থাকে, সেটা দেখবো।’
তবে কিছু কিছু কেন্দ্রে ব্যতিক্রমও দেখা গেছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচা হাইস্কুল ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
এদিকে সকাল ৯টার দিকে পুরান ঢাকার ঢাকা-৬ আসনের অন্তর্ভুক্ত কবি নজরুল সরকারি কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ, সেন্ট্রাল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, বাংলাবাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, ঢাকা গভমেন্ট মুসলিম হাই স্কুল কেন্দ্র সহ বেশ কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সবে দুয়েকজন ভোটার কেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন। তবে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে এখনও ফাঁকা।
কবি নজরুল কলেজ ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা না গেলেও নৌকার প্রার্থী সাঈদ খোকনের অনুসারীদের কেন্দ্রের আশেপাশে জড়ো হয়ে অবস্থান করতে দেখা যায়। দুয়েকজন মাত্র ভোট দিতে এসেছেন।
কবি নজরুল সরকারি কলেজ কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার মোহাম্মদ খাদেমুল ইসলাম জানান, এখানে আসলে তিনটি কেন্দ্র আছে। এরমধ্যে একটি পুরুষ, দুটি নারীদের। ইতিমধ্যেই ভোটার আসা শুরু হয়েছে। কয়েকজন ভোটও দিয়েছেন।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসা এক নারী ভোটার ভোট দিতে এসে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘আজ ভোটের পরিবেশ খুবই নিরিবিলি। আশেপাশে কোনও ঝামেলা নেই। সকালে বাসায় কাজ শেষ করে ভোট দিতে এসেছি। বেশ ভালো অনুভব করছি।’
কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিত না হওয়ার বিষয়ে সেন্ট্রাল গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজে অবস্থানরত নৌকার স্লিফ প্রদানকারী ইমতিয়াজ জানান, ঢাকার মানুষের একটু দেরিতে ঘুম ভাঙে। তাই এখনও কেন্দ্রে আসেনি। তবে মানুষ কেন্দ্রে আসতে শুরু করেছেন। কয়েকজন অলরেডি ভোটও দিয়েছে। আশাকরি আরো কিছু সময় পর ভোটারদের উপস্থিতি আরও বাড়বে।’
এদিকে নির্বাচন বর্জনের পাশাপাশি ভোটের আগেরদিন থেকে টানা ৪৮ ঘণ্টার হরতাল পালন করছে বিএনপিসহ সমমনা রাজনৈতিক দলগুলো। ভোটের দুই দিন আগে থেকেই বিভিন্ন যানবাহনের পাশাপাশি কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। যার ফলে কেন্দ্রে ভোটাররা কিছুটা ‘ভীত’ বলেও মন্তব্য করেছেন ভোট দিতে আসা নৌকার এক সমর্থক।
মো. রাতুল নামের এক ছাত্রলীগ কর্মী ও ভোটার বলেন, ‘দেশব্যাপী দুষ্কৃতিকারীরা জ্বালাও-পোড়াও শুরু করেছে। ফলে ভোটারদের মাঝে কিছুটা ভয়ভীতি কাজ করছে। তবে আমরা আশাবাদী দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোটে অংশ নিয়ে তাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করবে।’