এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরে আয়কর দেওয়ার জন্য আলাদা একটি শাখা চালু হবে। কেউ কর প্রদান করে না থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে ওই ডেস্কের কর্মকর্তারা তার কাছ থেকে আয়কর আদায় করবেন।আয়কর পরিশোধ সনদ দেখাতে না পারলে কিংবা প্রযোজ্য আয়কর ওখানে পরিশোধ না করলে তিনি বিমানবন্দর ত্যাগ করতে পারবেন না। সেই সঙ্গে বিদেশিদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানেও এনবিআরের গোয়েন্দা সেল অভিযান চালাবে। নিয়োগকর্তার ওপর আরোপ করা হবে জরিমানাও।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এনবিআর বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে পাওনা কর আদায়ে একটি টাক্সফোর্সও গঠন করেছে। টাস্কফোর্সে বিনিয়োগ বোর্ড, বেপজা,এনজিও ব্যুরো,এনএসআই, এসবি,পাসপোর্ট ও বহির্গমন বিভাগ,বাংলাদেশ ব্যাংক,বিটিআরসি থেকে প্রকৃত বিদেশি নাগরিকের তথ্য সংগ্রহ,সমন্বয় এবং সহযোগিতার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
দেশীয় কর খেলাপিদের সঙ্গে বাংলাদেশে বসবাসকারী কর খেলাপি বিদেশি নাগরিক এবং তাদের নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের আয়কর ও জরিমানা আরোপ করতে সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) সহযোগিতায় তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
এনবিআর কর্তৃপক্ষ বলেছে, বাংলাদেশে প্রকৌশল, চিকিৎসা, গার্মেন্টস, মার্চেন্ডাইজিং, শিল্প-কলকারখানা ইত্যাদি খাতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনে বিদেশি পরামর্শকসহ দক্ষ কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিদেশি নাগরিকরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে।অভিযোগ রয়েছে,অবৈধভাবে অনেক বিদেশিকর্মী বাংলাদেশে কাজ করছেন এবং অনেক বিদেশি নাগরিক স্বল্প সময়ের জন্য কাজ করে বিপুল পারিতোষিক গ্রহণপূর্বক কোনও আয়কর প্রদান ব্যতিরেকেই বাংলাদেশ ত্যাগ করছেন।এমতাবস্থায় বৈধ এবং অবৈধ উভয় ধরনের নাগরিকদের এবং তাদের নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের ওপর প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আয়কর কার্যক্রম মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি।
এ প্রসঙ্গে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান বলেন,যেসব বিদেশি নাগরিক বর্তমানে বাংলাদেশে কাজ করছেন তাদের কাছ থেকে যথাযথ আয়কর সংগ্রহ করা এবং ভবিষ্যতে যারা এদেশে আসবেন তারা যেন বৈধভাবে কাজ করতে পারেন এনবিআর সে লক্ষ্যে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এগুচ্ছে। তিনি আরও বলেন,প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হলে দেশে অবৈধভাবে কোনও বিদেশি নাগরিকের কাজ করার সুযোগ থাকবে না। পাশাপাশি যারা বৈধভাবে কাজ করছেন,তারা প্রচলিত আয়কর আইন অনুযায়ী কর পরিশোধ করে স্বচ্ছন্দে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এছাড়া,বিদেশে অর্থ পাঠানো সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বিষয়ক তথ্য কর বিভাগে প্রদান করা এবং প্রকৃত অর্থ পরিশোধের তথ্য উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যাবে বলে মনে করেন চেয়ারম্যান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়,দেশের গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল কারখানা,বায়িং হাউজ,এনজিও, বহুজাতিক কোম্পানি,তথ্য-প্রযুক্তি কোম্পানি,অবকাঠামো নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কয়েক লাখ বিদেশি কাজ করেন।অথচ তাদের প্রকৃত সংখ্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।তাদের বেতনের প্রকৃত অংকও গোপন করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী,প্রতিবছর গড়ে ১২ হাজার বিদেশি তাদের কাছ থেকে ওয়ার্ক পারমিট নেয়। এর বাইরে বেপজা ও এনজিও বিষয়ক ব্যুরো’র কাছেও কয়েক হাজার বিদেশি কর্মীর নিবন্ধন রয়েছে।বিদেশি কর্মীদের বেশিরভাগই প্রতিবেশী ভারতের।এর বাইরে শ্রীলঙ্কা,চীন,ভিয়েতনাম,ফিলিপাইন,পাকিস্তান ছাড়াও আফ্রিকা,ইউরোপ ও আমেরিকার নাগরিকরা বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতে কাজ করেন।
অভিযোগ রয়েছে,বৈধভাবে কাজ করছেন এমন বিদেশি নাগরিকরা প্রকৃত আয় গোপন করে বড় অঙ্কের কর ফাঁকি দিচ্ছেন।আর এর কয়েকগুণ কর ফাঁকি দিচ্ছেন অবৈধভাবে কর্মরত বিদেশিরা।অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্তরা কোনও ধরনের করের আওতায় নেই। এসব অবৈধ নাগরিক দেশের নিরাপত্তার জন্যও হুমকি বলে মনে করছে দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।
এনবিআর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তারা জানান,বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ভিসায় প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। তবে এর মধ্যে মাত্র ১০ হাজার জনের কাজ করার বৈধ অনুমতি আছে। আর তাদের মধ্যেও বেশিরভাগই আয়কর দেন না। আয়কর আইন অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের আয়ের ৩০ শতাংশ কর দিতে হয়।
সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজিত বিপিএল খেলতে এসে ৫০ জনেরও বেশি বিদেশি খেলোয়াড় অংশগ্রহণ করলেও তাদের অনেকেই কর প্রদান না করেই দেশে ফিরে যান।ওই করের বড় অংশ এখনও আদায় করা সম্ভব হয়নি।এ প্রক্রিয়ায় অনেক বিদেশি নাগরিকই কর ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশ ছাড়ছেন।এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন,বিমানবন্দর এলাকায় আয়করের আলাদা ডেস্ক থাকলে এবং আয়কর ছাড়পত্র সনদ নেয়ার নিয়মটি বাধ্যবাধকতা থাকলে বিদেশিরা এভাবে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পেতেন না।
/এসআই/এমএসএম/এপিএইচ/