নিয়োগ-বিজ্ঞাপন-প্রকাশনা-পদোন্নতি নিয়ন্ত্রণ

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে অবসরপ্রাপ্তরাই ক্ষমতাশালী!


ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশসাবেক চার পরিচালকের প্রভাবে তটস্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অবসর নেওয়ার পরও এই চারজন কর্মকর্তা প্রতিষ্ঠানটির সর্বস্তরে প্রভাব বিস্তার করে চলেছেন। মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে তারা ফাউন্ডেশনের নিয়োগ প্রক্রিয়া,বিজ্ঞাপন,প্রকাশনা,বিক্রয়,কর্মচারী-কর্মকর্তাদের পদোন্নতি-বদলিসহ নানা কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। পাশাপাশি ফাউন্ডেশনের সরকারি সভা বা বৈঠকে অংশ নিয়ে সব ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব খাটাচ্ছেন। কোণঠাসা হওয়ার ভয়ে প্রতিষ্ঠানের কোনও কর্মকর্তাই এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
তবে সাবেক এই কর্মকর্তারা বলছেন,একমাত্র মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজাল ডাকলেই তারা প্রতিষ্ঠানের কাজে যুক্ত হন। তারা কোনও ধরনের প্রভাব বা নিয়ন্ত্রণ করেন না। এ ব্যাপারে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে মহাপরিচালক সামীম আফজাল ফোন রিসিভ করেননি।
অনুসন্ধানে জানা যায়,এই ক্ষমতাধর চার ব্যক্তি হলেন সাবেক পরিচালক (সমন্বয়) হারুনুর রশীদ, নুরুল ইসলাম মানিক (প্রকাশনা), সাহাব উদ্দিন খান (পরিকল্পনা) এবং আবু হেনা মোস্তফা কামাল। তারা ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সব ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। এর মধ্যে হারুনুর রশীদ প্রায় ৪ বছর আগে প্রতিষ্ঠান থেকে বিদায় নিয়েছেন। এক বছর আগে অবসরে গেছেন আবু হেনা। সম্প্রতি অবসরে গেছেন সাহাব উদ্দিন। কাছাকাছি সময়ে অবসরে গেছেন নুরুল ইসলাম মানিক।

অনুসন্ধানে জানা গেছে,সাবেক এই পরিচালকদের মধ্যে এগিয়ে আছেন হারুনুর রশীদ। প্রায় ৪ বছর আগে অবসরে গেলেও তিনি নিয়মিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনে নানা কাজে যুক্ত থাকেন।অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন সভায়।সফর করেন বিভিন্ন জেলায়ও।দাওয়াতি প্রোগ্রামেও অংশ নেন তিনি।বিগত সীরাতুন্নবী উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানে হারুনুর রশীদই কো-অর্ডিনেটর ছিলেন।আগামী ২২ মার্চে অনুষ্ঠিতব্য ৪১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানেও তিনিই আয়োজকদের অন্যতম।অভিযোগ আছে,চাপ দিয়ে বিভিন্ন জেলার কর্মচারী-কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ও করেন তিনি।

তবে হারুনুর রশীদ দাবি করেন,তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যে ও ষড়যন্ত্র।  ডিজি সাহেব যখন ডাকেন,তখনই যাই। আমি প্রতিদিন যাই না। আর অবসরে যাওয়ার পর এখতিয়ার নাই হস্তক্ষেপ করার। কিছু লোক আছে যারা প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটাচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা,যিনি ঢাকার বাইরের একটি জেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শাখায় কর্মরত, বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি জানান, আমি তো পয়সা নিয়ে পদোন্নতি ঠেকাতে হাইকোর্টে মামলা করেছি। এই চারজনের মধ্যে অপকর্মে এগিয়ে আছেন হারুনুর রশীদ। তিনি তো প্রতিদিন অফিসে আসেন। লাজ-লজ্জা নাই। তবে একটু শিক্ষায় বেশি আবু হেনা মোস্তফা কামাল,সাহাব উদ্দিন, তার মতো অতোটা না।

জানা গেছে, গত ১১ ফেব্রুয়ারি মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের একটি প্রকল্পের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সাহাব উদ্দিন খানকে প্রকল্প পরিচালক এবি এম শফিকুল ইসলাম চিঠি দেন। এ নিয়ে জানতে চেয়ে ফোন করা হলে সাহাব উদ্দিন খানের নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির বিষয়টিও মামলা দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে।এই চারজন নিজেদের প্রভাব নিরঙ্কুশ করতে মহাপরিচালক সামীম মোহাম্মদ আফজালকে খুশি রাখার চেষ্টা করেন। এ কারণে অন্যান্য কর্মকর্তারা বিষয়টি মানতে না পারলেও মুখ ফুটে কিছু বলতে চান না। এ নিয়ে একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটির অন্তত ১২ জন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করেননি।

আবু হেনা মোস্তফা কামাল ও নুরুল ইসলাম মানিক অবসরে গেছেন প্রায় বছর খানেক আগে। কর্মচারী-কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তাদের সাবেক কর্মস্থলকে রুটিরুজির রাস্তা বানিয়ে রেখেছেন। মূল্যায়ন করছেন বিভিন্ন প্রকল্পের। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাদের ভূমিকাও অনেকটা সক্রিয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবু হেনা মোস্তফা কামাল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, অবসরের পর কেন যাব। আমি দু’সপ্তাহ ধরে যাই না। এছাড়া আমি প্রকাশনা বিভাগে থাকাকালীন মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুসহ নানা বিষয়ে কাজ করেছি।

তার দাবি, সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এমন কোনও বৈঠকে তিনি অংশ নেন না। কোনও প্রকল্পে ডিজি মনে করলে অংশ নেন। পদোন্নতি,বদলি ইত্যাদি কাজে তার কোনও ভূমিকা নেই। আবু হেনা আরও বলেন,আমি শুনেছি আমাকে স্মরণিকা কমিটিতে রাখা হয়েছে। আমি কিন্তু লিখিতভাবে কিছু পাইনি। মৌখিকভাবে জেনেছি। আমি তো অতটা মেধাহীন না।

তবে অনুসন্ধান বলছে উল্টো কথা।সম্প্রতি ৪১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষ্যে স্মরণিকা কমিটি গঠন করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এই কমিটিকে স্মরণিকার পাশাপাশি পত্রিকায় ক্রোড়পত্র প্রকাশের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে,এই কমিটি ডিজির সঙ্গে আলাপ করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। যদিও আবু হেনা মোস্তফা কামাল এটিকে ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণ’ বলতে নারাজ। তার দাবি, এটি কেবল একটি ইস্যুভিত্তিক প্রকল্প। যেখানে চাইলেই ডিজি যে কাউকে রাখতে পারেন। জানতে চাইলে এই কমিটির কোনও সদস্যই ফোন রিসিভ করেননি।

যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত সাবেক পরিচালক নুরুল ইসলাম মানিককে পাওয়া যায়নি। সামীম মোহাম্মদ আফজালকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে একটি সূত্র দাবি করেছে, তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এব্যাপারে যোগাযোগ করা হয় প্রতিষ্ঠানের সচিব মো.অহিদুল ইসলামের সঙ্গে। তার ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়।

এসটিএস/এমএসএম/এপিএইচ/