একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল অপহরণ, গুম, খুন ও নির্যাতনসহ ১৪টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করেছিলেন। ট্রাইব্যুনালের বিচারে এই ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত এবং বাকি ৪টি অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
এর আগে চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ৩৫১ পৃষ্ঠার রায়ে বলেন, মীর কাসেমের বিরুদ্ধে যে ১৪টি অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর ১৩টির বিষয়েই একমত হয়েছেন ট্রাইব্যুনালের-৩ এর বিচারপতিরা। শুধু একটি অভিযোগের বিষয়ে একমত হতে পারেননি। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ওই অভিযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
প্রমাণিত অভিযোগুলোর মধ্যে দুটিতে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ১১ নম্বর অভিযোগ। এ অভিযোগ অনুযায়ী, একাত্তরে ঈদুল ফিতরের দিনে মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিনকে অপহরণ করে আলবদর বাহিনী। তাকে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। সেখানে আরও পাঁচজনকে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা জসিমের লাশের সঙ্গে তাদের লাশও গুম করে আলবদর বাহিনী। এসব হয়েছে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে।
আর ১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের নভেম্বরে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, রণজিৎ দাস লুথু ও টনটু সেন রাজুকে চট্টগ্রামের হাজির লেন থেকে অপহরণ করে নির্যাতন করে আলবদর বাহিনী। জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে ডালিম হোটেল থেকে কয়েকদিন পর মুক্তি দেওয়া হয়। কিন্তু লুথু ও রাজুকে কাসেমের নির্দেশে হত্যা করে আলবদর বাহিনী। তাদের লাশও গুম করে দেওয়া হয়। কাসেমের নির্দেশে আলবদর, আলশামস ও পাকিস্তানি সেনারা ওই এলাকার ২০০ থেকে আড়াইশ বাড়িঘর ও দোকান আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বী শতাধিক লোককে দেশ ছেড়ে ভারতে যেতে বাধ্য করে।
এ অভিযোগে মীর কাসেমকে দোষী সাব্যস্ত করতে একমত হননি তিন বিচারপতি। দু’জন বিচারপতি এই অভিযোগে মীর কাসেমকে ফাঁসির আদেশ দিলেও একজন বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেছেন। রায়ে বলা হয়েছে, ১১ নম্বর অভিযোগে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের আদেশের সঙ্গে ১২ নম্বর অভিযোগে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের আদেশটি একীভূত হয়ে যাবে।
মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো:
১. মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী ১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর ওমরুল ইসলাম চৌধুরীকে চাকতাইঘাট থেকে অপহরণ করা হয়। এরপর তাকে কয়েক দফায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেল, পাঁচলাইশ থানার সালমা মঞ্জিল এবং একটি চামড়ার গুদামে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
২. আসামির নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর চাকতাই থেকে লুৎফর রহমান ফারুককে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়।
৩. ২২ অথবা ২৩ নভেম্বর আসামির নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে তার কদমতলার বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়।
৪. ডবলমুরিং থানার সালাহউদ্দিন খানকে তার নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে আলবদর বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন।
৫. ২৫ নভেম্বর আনোয়ারা থানার আবদুল জব্বারকে তার নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে মীর কাসেম আলীর সামনে হাজির করা হয়। এরপর তাকে নির্যাতন করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
৬. চট্টগ্রাম শহরের একটি চায়ের দোকান থেকে হারুন-উর রশিদ নামে একজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেল এবং সালমা মঞ্জিলে নির্যাতন করা হয়।
৭. মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে ৭-৮ জন যুবক ডবলমুরিং থানা থেকে সানাউল্লাহ চৌধুরীসহ দুজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়।
৮. ২৯ নভেম্বর রাতে নুরুল কুদ্দুসসহ চারজনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন।
৯. ২৯ নভেম্বর সৈয়দ মো. এমরানসহ ৬ জনকে অপহরণ ও নির্যাতন।
১০. আসামির নির্দেশে মো. জাকারিয়াসহ চারজনকে অপহরণ ও নির্যাতন।
১১. শহীদ জসিম উদ্দিনসহ ৬ জনকে অপহণের পর নির্যাতন করা হয়। এতে জসিমসহ পাঁচজন নিহত হন এবং পরে লাশ গুম করা হয়। ঈদের পরদিন জসিমকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
১২. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীসহ তিনজনকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়। এতে দুজন নিহত হন এবং তাদের লাশ গুম করা হয়।
১৩. সুনীল কান্তিকে অপহরণ ও নির্যাতন
১৪. নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে অপহরণ ও নির্যাতন।
/ইউআই/এসটি/