ফাঁসি হওয়া, না হওয়া নিয়ে সব উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাসেম আলীকে আপিলেও ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চ।
এই মামলায় শুনানির সময় প্রকাশ্য আদালতে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন নিয়ে করা প্রধান বিচারপতির বক্তব্যকে নিয়ে নানা উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছিল। একাত্তরে নির্যাতনের কারণে ‘বাঙালি খান’ নামে খ্যাত মীর কাসেম আলীর চূড়ান্ত শাস্তি হবে কিনা সে নিয়ে উৎকণ্ঠা নিয়ে বিচারপ্রার্থীরা অপেক্ষা করেছেন চূড়ান্ত রায় ঘোষণার।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি রায়ের জন্য নির্ধারিত দিন ঘোষণার পর থেকে মামলা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সমালোচনা করায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা কি বোঝাতে চেয়েছেন সেটা নিয়ে চলছে আলাপ আলোচনা। সর্বশেষ গত শনিবার প্রধান বিচারপতিকে বাদ দিয়ে নতুন বেঞ্চ গঠন করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী অপরাধী মীর কাসেম আলীর আপিলের পুনঃশুনানি দাবিও করেছেন সরকারের একাধিক মন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল জামায়াতের অর্থ যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত মীর কাসেমের। যদিও সোমবারই অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, মীর কাসেম আলীর যুদ্ধাপরাধ মামলায় আপিলের রায়ে বাইরের কোনও আলোচনার প্রভাব পড়বে না, আদালত মামলার সাক্ষ্য-প্রমাণ যুক্তিসমূহ দেখে রায় ঘোষণা করবেন।
তিনি বলেন, ‘বিচার বিভাগে সাজা নির্ভর করে সাক্ষী ও তথ্যের ওপর। এ বিষয়ে বাইরে থেকে কে কী বলল, লিখল এটি বিবেচ্য বিষয় নয়।’
এর আগে মীর কাসেমের মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা মীর কাসেম আলীর মামলা এবং অন্যান্য মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যুনালের ইনভেস্টিগেটর ও প্রসিকিউটরদের কাজের ওপর গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট খরচ হচ্ছে এদের পেছনে, কিন্তু সে রকমভাবে, সঠিকভাবে তদন্ত ও মামলা পরিচালনা করছেন না বলে তাদের কাছে মনে হয়েছে।’
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আপিলের শুনানি শেষে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর আনা আপিল মামলার রায় ঘোষণার জন্য ৮ মার্চ দিন ধার্য করে দেন।
২৪ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বেঞ্চে মীর কাসেমের বিপক্ষে শুনানি শেষে রায় ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়। এ বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।
আপিল বিভাগে যুদ্ধাপরাধ মামলায় এর আগের ছয়টি রায়ের মধ্যে চারটিতে জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে।
আপিল বিভাগের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশিত হওয়ার পর দুই পক্ষের করা রিভিউ আবেদন এখন নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। আর সর্বশেষ রায়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামীর সর্বোচ্চ সাজা বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ হলে দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু করবে কারা কর্তৃপক্ষ।
২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মীর কাসেম আলীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এ রায়ের বিরুদ্ধে ওই একই বছরের ৩০ নভেম্বর আপিল করেন মীর কাসেম আলী। দেড়শ’ পৃষ্ঠার মূল আপিলসহ ১ হাজার ৭৫০ পৃষ্ঠার আবেদনে ১৬৮টি কারণ দেখিয়ে ফাঁসির আদেশ বাতিল করে খালাস চেয়েছেন তিনি।
৮ জনকে নির্যাতনের পর হত্যা ও মরদেহ গুম এবং ২৪ জনকে অপহরণের পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন নির্যাতন কেন্দ্রে আটকে রেখে নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী ১৪টি অভিযোগে অভিযুক্ত হন মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনীর তৃতীয় শীর্ষ নেতা এবং সেই সময়ের ইসলামী ছাত্র সংঘের সাধারণ সম্পাদক মীর কাসেম আলী। এ ১৪ অভিযোগের মধ্যে ১০টি প্রমাণিত হয়। বাকি ৪টি অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে মীর কাসেমের আপিল মামলাটির শুনানি শুরু হয়। আপিল বিভাগের এক নম্বর বিচারকক্ষে ৭ কার্যদিবসে এ মামলার শুনানি ২৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়।
/ইউআই/এসটি/