৭৫ শতাংশ রোগী কিডনি চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন না!

কিডনিবাংলাদেশে প্রায় দুই কোটিরও বেশি মানুষ কিডনির সমস্যায় ভুগছেন। অপরদিকে প্রতি ঘণ্টায় কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে পাঁচ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করছেন। অথচ কিডনি রোগের চিকিৎসা এতোই ব্যয়বহুল যে, দেশের শতকরা ৭৫ শতাংশ কিডনি রোগী এতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে সমর্থ হন না। এতে করে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছেন। আর কিডনি রোগের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আক্রান্তরা হলেন উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসে ভোগা মানুষেরা। কিডনি অ্যাওয়ারনেস মনিটরিং অ্যান্ড প্রিভেনশন সোসাইটি (ক্যাম্পস) থেকে জানা গেল এসব তথ্য।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, একটু সচেতন হলেই কিডনি রোগে আক্রান্ত ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে নিস্তার পাওয়া সম্ভব।প্রতিরোধ করা সম্ভব কিডনি বিকল হওয়া। তবে এ সচেতনতার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন প্রাথমিক অবস্থায় রোগটির শনাক্তিকরণ এবং তার চিকিৎসা। তবে বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন,কিডনি রোগের চিকিৎসার জন্য প্রথমেই দরকার এ সংক্রান্ত ওষুধের দাম কমানো,একইসঙ্গে এই রোগের ডায়ালাইসিসে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির আমদানিতেও কর মওকুফ করার ব্যবস্থা নিতে হবে।  
বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ পালিত হচ্ছে বিশ্ব কিডনি দিবস। আজকের দিনের প্রতিপাদ্য কিডনি রোগ ও শিশু: প্রতিরোধে আগেই ব্যবস্থা নিন। জানা গেল, শিশুরাও রয়েছে কিডনি রোগের ঝুঁকিতে। শিশুসহ প্রাপ্ত বয়স্কদের জীবনযাত্রার পদ্ধতি বদলাতে হবে এজন্য।
জানতে চাইলে ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতালের কিডনি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডাঃ এম এ সামাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের সবাইকে কিডনি রোগের ভয়াবহতা সর্ম্পকে জানতে হবে। শিশুরাও এর বাইরে নয়। জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। নয়তো এ রোগ থেকে আমাদের নিস্তার নেই। তিনি বলেন, শুধুমাত্র জীবনযাত্রার পরিবর্তন করে কিডনি রোগের ৬৮ শতাংশ মৃত্যু ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে প্রমাণিত হয়েছে।

কিভাবে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পর্যাপ্ত পরিমাণে সবজি ও ফল খেতে হবে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। কারণ ওবেসিটি থেকে শিশুদের কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে, কায়িক পরিশ্রম বাড়াতে হবে,শিশুদের খেলাধূলা করতে হবে এবং ধূমপান থেকে বিরত থাকতে হবে। শিশুদের জাংক ফুড থেকে বিরত রাখতে হবে। কারণ, জাংক ফুড কিডনির অন্যতম প্রধান শত্রু। অতিরিক্ত লবন,কিডনি রোগের প্রতিরোধে সবাইকে চর্বি জাতীয় ও ভেজাল খাবার থেকেও দূরে থাকতে হবে  ।

জানতে চাইলে প্রিভেনটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বাংলাদেশে কিডনি রোগ ক্রমাগত বাড়ছে। আমরা মনে করছি, কিডনি রোগ বাড়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, খাদ্য এবং খাদ্যজাত দ্রব্যাদির সঙ্গে অতিরিক্ত কীটনাশক, রাসায়নিক এবং প্রিজারভেটিভসহ নানাবিধ কারণ। এবং এই বৃদ্ধিটি এখন আতঙ্কজনক। যার কারণে ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে ২ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। কিডনি রোগী হওয়ার কারণে দুধরনের সমস্যা হয়। শুধুমাত্র কিডনি রোগী হওয়াতে শারীরিক কষ্ট এবং আরেকটি কারণ হচ্ছে, এই রোগের চিকিৎসা এতোটাই ব্যয়বহুল যে, রোগীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে তার পরিবার খরচ জোগাতে ভিটেমাটিসসহ সর্বস্ব হারাতে হয়। মানুষ দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হয়। অর্থাৎ, এরকম একটি কিডনি রোগী যখন বেঁচে থাকেন, তখন তার পরিবার যা করেন মৃত্যুর পরে সেই রোগীটিরই কেবল মৃত্যু হয়না, সেই পরিবারটিরও পথে বসার অবস্থা হয়। আমরা জানি, প্রতিবছর আমাদের দেশে প্রায় ৪০ লাখের মতো মানুষ কেবলমাত্র চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে দারিদ্রসীমার নিচে চলে আসে। এবং সেখানে যে কয়টি অসুখের কারণে এটি হয় তার মধ্যে কিডনি রোগ অন্যতম প্রধান।

এ থেকে পরিত্রাণ পেতে ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বেশকিছু পদক্ষেপ রয়েছে। জীবনযাপনের পদ্ধতি বদলাতে হবে। প্রাপ্ত বয়স্ক একজন মানুষকে প্রতিদিন তিন থেকে সাড়ে তিন লিটার পানি পান করতে হবে।নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। মূত্রথলী এবং মূত্রনালীর কোনও ইনফেকশন হলে চিকিৎসা করাতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,ব্যথানাশক ঔষধ কখনও নিজের ইচ্ছামাফিক খাওয়া চলবে না। খাবারের ক্ষেত্রে, দূষণমুক্ত, ভেজালমুক্ত খাবারের দিকে জোর বেশি দিতে হবে। প্রতিদিন সময় ধরে হাটাহাটি কিংবা ব্যায়াম করতে হবে। এগুলোর মধ্য দিয়েই কিডনিকে সুস্থ রাখতে হবে। সবশেষে কিডনি হচ্ছে শরীরের একটি ড্রেন লাইনের মতো, যার মধ্য দিয়ে রাসায়নিক এবং অতিরিক্ত দূষিত পানি শরীর থেকে বের হয়ে যায়। এটি বন্ধ হলে মানুষের যেসব কলকব্জা রয়েছে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। সুতরাং, কিডনির সুস্থতায় নজর দিতে হবে সর্বাগ্রে।

এপিএইচ/