রামপুরায় দুই সন্তান হত্যা

র‌্যাবের দেওয়া তথ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে পুলিশ

মায়ের সঙ্গে অরনী ও আলভীদুই সন্তান হত্যার বিষয়ে র‌্যাবের দেওয়া তথ্যের বাইরে এখন পর্যন্ত আর কোনও তথ্য পায়নি পুলিশ।তাই দ্বিতীয় দফায় তাকে পাঁচদিনের রিমান্ড-এ নেওয়া হয়েছে। হত্যার কথা মা মাহফুজা মালেক জেসমিন স্বীকার করলেও গত দশদিনে এর গ্রহণযোগ্য কোনও কারণ পায়নি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। তাই তাকে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের দাবি, ‘হিট অব দ্য মোমেন্টে’ হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। এরপর মা নিজে বাঁচার জন্য মিথ্যার পর মিথ্যা গল্প সাজিয়েছেন।
গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বিকালে রামপুরার বনশ্রীর বি-ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ৯ নম্বর বাসার পঞ্চম তলায় নুসরাত আমান অরনী (১২) ও আলভী আমান (৭)কে তার মা জেসমিন হত্যা করেন বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে স্বীকার করেছেন। এখন চলছে মায়ের স্বীকারোক্তির যাচাই-বাছাই। খোঁজা হচ্ছে হত্যার পেছনের কারণ।
দুই সন্তানের মা জেসমিনকে গ্রেফতারের পর র‌্যাবের মুখপাত্র ‍মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছিলেন,‘সন্তানদের ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।’

পুলিশও একই ধরণের তথ্য পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) খোন্দকার নুরুন্নবী।

তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জেসমিন একই ধরণের কথা বলছেন। তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। সন্তানরা পড়াশোনায় ভাল করতেছিল না। তারা পরীক্ষায় ৫০ শতাংশের বেশি  নম্বর পেতো না। সামনে মেয়েটির পিএসসি পরীক্ষা ছিল, সে লেখাপড়ায় ভাল করছিল না। ছেলে কোনও ভাল স্কুলে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছিল না। এসব নিয়েই তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। অনেক বেশি হতাশ ছিলেন। কাউকে এসব শেয়ারও করেননি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজেই আত্মহত্যা করবেন, তবে কয়েকবার চেষ্টা করেও তিনি পারেননি বলে আমাদের জানিয়েছেন।’

ঘটনার দিনের বর্ণনা দিয়ে নুরুন্নবী বলেন, ‘ওই দিন দুই গৃহশিক্ষিকা বাসা থেকে পড়িয়ে যাওয়ার পর মূলত এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। অংকের গৃহশিক্ষক পড়িয়ে যাওয়ার পর অরনী তার মাকে গিয়ে বলে, ‘অংকের শিক্ষক আমাকে অংক করতে দিয়েছিলেন কিন্তু আমি পারিনি মা। আমিতো এগুলো বুঝিনা। বেশিরভাগ অংক মিস করছি। তখন মা রাগ করে তার ওড়না দিয়ে প্রথমে মেয়েটিকে হত্যা করে। পরে ছেলেটিকে।’

জেসমিন অসুস্থ কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনও বিশেষজ্ঞ না। আদালত যদি মনে করেন তার মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা জানার জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করা দরকার, তা করতে পারেন। তবে এবিষয়ে আমরা কোনও মন্তব্য করতে পারি না।’

দুই সন্তান হত্যার পর মা জেসমিন ও খালা মিলা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, খাবারের বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়না তদন্তে চিকিৎসকরা জানান, তাদের হত্যা করা হয়েছে। এরপর শিশুদুটির পরিবারের সদস্য, শিক্ষক, বাসার নিরাপত্তারক্ষী ও চাইনিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার, বাবুর্চিসহ কয়েকজনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ১ মার্চ লাশ দাফনের পর গ্রামের বাড়ি থেকে দুই সন্তানের বাবা আমান উল্লাহ ও মা মাহফুজা মালেক জেসমিনকে ঢাকায় নিয়ে আসে র‌্যাব। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে সন্তানদের হত্যার কথা স্বীকার করেন মা জেসমিন। এরপর সন্তানদের বাবা আমান উল্লাহ বাদী হয়ে রামপুরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় সন্তানদের মাকেই একমাত্র আসামি করা হয়। ওই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রামপুরা থানার পরিদর্শক মোস্তাফিজুর রহমান শুক্রবার আসামি জেসমিনের দশদিনের রিমান্ড চান। আদালত পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গত বুধবার ওই পাঁচদিনের রিমান্ড শেষ হয়। ওইদিনই মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে ডিবি পুলিশ আদালতের অনুমতি নিয়ে তদন্তভার গ্রহণ করে।

ডিবি পরিদর্শক লোকমান হেকিম গত বুধবার ফের দশদিনের রিমান্ড চান, আদালত তাকে পাঁচদিনের রিমান্ড দিয়েছেন। তাকে ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

হত্যাকাণ্ডের পর সবকিছু স্বীকার করার পরও কেনও দ্বিতীয় দফায় রিমান্ড নেওয়ার প্রয়োজন হলো? এর জবাবে খোন্দকার নুরুন্নবী বলেন, ‘কারণ আমি মনে করেছি রিমান্ডে নিতে হবে তাই। কারণ মামলার প্রতিবেদনতো আমরা দেবো। থানা পুলিশ দেবে না। তাই আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার।’

এখন পর্যন্ত সন্তানদের লেখাপড়া ছাড়া আর কোনও কারণ খুঁজে পায়নি পুলিশ। এছাড়া আর কোনও কারণ নেই বলেও তারা নিশ্চিত। নুরুন্নবী বলেন, ‘অন্য কোনও কারণ থাকলে, একদিনের মধ্যে বের করে ফেলতাম। আর কোনও কারণ আমরা পাইনি।’

/এআরআর//এপিএইচ/