বিভিন্ন ধরনের নাশকতা-অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা থামানোর জন্য ২০১৫ সালে ডিএমপি ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেয়। গত বছর এ বিষয়ে তেমন কোনও পুলিশি উদ্যোগ না থাকলে ২০১৬-এর শুরু থেকে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেয়। এক পৃষ্ঠার একটি সাদা ফরম ভাড়াটিয়াদের পূরণ করতে দেওয়া হচ্ছে। সেখানে ভাড়াটিয়ার ছবির পাশাপাশি তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, পাসপোর্ট নম্বর, ফোন নম্বর, জন্ম তারিখ, পেশাসহ বাসার বাসিন্দা এবং গৃহকর্মী ও ড্রাইভারের তথ্য চাওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের লোগো সংবলিত ওই ফরমের ফটোকপি বাড়ি-বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আবার তা সংগ্রহ করছেন পুলিশ সদস্যরা।
পুলিশের এই উদ্যোগের পর রাজধানীবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ-কেউ আন্তরিকতার সঙ্গে ফরম পূরণ করে দিলেও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন ব্যক্তিগত তথ্য পুলিশকে জানাবেন কেন। অনেকে অভিযোগ করেছেন, ব্যক্তিগত তথ্য গোপণ রাখা একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার পুলিশ সেই অধিকার ভঙ্গ করতে পারে না।
পুলিশের এই কার্যক্রম চ্যালেঞ্জ করে গত ৫ মার্চ আদালতে রিট আবেদন করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। এর আগে গত ৩ মার্চ ভাড়াটিয়াদের তথ্য সংগ্রহে পুলিশের উদ্যোগের আইনগত ভিত্তি কী—তা জানতে চেয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব, আইনসচিব, পুলিশের আইজি ও ডিএমপি কমিশনারকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। নোটিশ প্রাপ্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দেয়ার কথা বলা হলেও সরকারে পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনও জবাব দেওয়া হয়নি। পরে তিনি হাইকোর্টে এই কার্যক্রমের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন।
এর আগে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে রাজধানীতে বসবাসকারী নাগরিকদের তাদের তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সিআরপি’র ৪২ ধারা অনুযায়ী পুলিশকে সহায়তা করতে প্রতিটি নাগরিক বাধ্য। এছাড়া, একজন সুনাগরিকের সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে পুলিশকে আইনি কাজে সহায়তা করার। সামাজিক অপরাধ, ছিনতাই, জঙ্গিবাদ ও ইভটিজিংয়ের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে গত নভেম্বর থেকে পুলিশ নাগরিকদের তথ্য সংগ্রহ করছে। ডিএমপির প্রতিটি থানায় সর্বনিম্ন দুটি এবং সর্বোচ্চ ৯টি বিট করা হয়েছে। বিট ইনচার্জ থাকবেন একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই)। তার কাছে ওই বিটের সব তথ্য থাকবে। এতে বিটের আওতাধীন স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, বিদেশি নাগরিক, পেশাজীবীদের সব তথ্য তার কাছে থাকবে। পুলিশের নিরাপত্তা দিতে সুবিধা হবে।
কমিশনার আছাদুজ্জামানের এই আহ্বানের পাঁচ দিনের মাথায় ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেছেন, আইন মেনে চলা একজন নাগরিক হিসেবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আইনগত সহায়তা করতে আমি ইচ্ছুক। তবে যে সহায়তা তারা চাইছেন, তা তাদের আইনি এখতিয়ারে পড়ে না। এভাবে ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার মতো কোনও আইনি সুযোগ পুলিশের নেই। তিনি বলেন, এ সব তথ্যের অপব্যবহার হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এছাড়া, এসব তথ্য যদি কোনও ভুল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে পড়ে, তাহলে মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন হতে পারে।
রিটে সংবিধানে নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, পুলিশের এ উদ্যোগে তাও ভঙ্গ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
এদিকে, রাজধানীর বেশ কয়েকটি থানায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আদালতে রিট হওয়ার পর আর কেউ তথ্য দিচ্ছে না। কোনও কোনও থানা তথ্য পেলেও তা খুবই কম। বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়ারা রিটের আদেশের অপেক্ষায় রয়েছেন।
মিরপুর দশ নম্বরের বেনারশীপল্লীর ২ নম্বর সড়কের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম বলেন, অপরাধাদির চিহ্নিত করতে পুলিশের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। তবে পুলিশকে ব্যক্তিগত তথ্য দেওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে ভীতি রয়েছে। আমারও তা রয়েছে।
তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে কাফরুল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শিকদার মোহাম্মদ শামীম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তথ্য সংগ্রহের কার্যক্রম জোরেসোরে চলছে। এলাকার সবাইকে ফরম দেওয়া হয়েছে। এখন ফরম সংগ্রহ করা হচ্ছে।
কত শতাংশ মানুষ এখন পর্যন্ত ফরম পূরণ করে দিয়েছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, শতাংশের হিসাব এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। ফরম সংগ্রহের কাজ চলছে। ১৫ মার্চের ভেতরে সব ফরম সংগ্রহ করা হবে। তখনই জানাব।
পুলিশের তথ্য সংগ্রহের কাজের সমালোচনা করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, যে ফরমটিতে তথ্য দিতে বলা হচ্ছে, সেই ফরমটি যে পুলিশের তা আমার বিশ্বাস হয়নি। কারণ ফরমে কোনও কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর নেই। ফটোকপি করা একটি সাধারণ ফরমে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। পুলিশ যে তথ্য সংগ্রহ করে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা দিবে এমন কোনও কথাও ফরমটির কোথাও লেখা নেই। যা আমাকে পূর্ণ বিশ্বস্ততা দেয়নি।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর জামাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের কাজ স্বাভাবিক গতিতেই চলছে। রিট হওয়ার পর বাড়ছে না কমছে তা বলতে পারব না। তবে আশাকরছি ১৫ মার্চের মধ্যে কার্যক্রম শেষ হয়ে যাবে।
কমিশনারের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ চলছে বলেও তিনি যোগ করেন।
মোহাম্মদপুরের নবোদয় হাউজিংয়ের একটি বাড়ির কেয়ারটেকার মো. হাবীব। পুলিশের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ভাড়াটিয়াদের দিয়েছেন। তবে এখনও তিনি ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেননি। তিনি অপেক্ষা করছেন, হাইকোর্টের রিটের আদেশে কী আসে, তা দেখে তিনি ফরম জমা দেবেন।
ধানমণ্ডি থানার পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের ৪০ শতাংশ ফরম পূরণ হয়ে থানায় ফেরত এসেছে। বাকি দুতিন দিনের মধ্যে মাঠে থাকা ফরম ফেরত আনা হবে। সবাই ফরম পূরণ করছেন বলে তারা দাবি করেছেন।
কামরাঙ্গীরচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মহসীন আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রিটের আগেই তাদের ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছিল। রিট হওয়ার পর তথ্য সংগ্রহ তেমন কমেনি। আমার এলাকার ৮০ শতাংশ বাসিন্দার ফরম পূরণ করা হয়েছে। বাকি সময়ের মধ্যে অন্য বাসিন্দাদের তথ্য পাওয়া যাবে।
এদিকে, রাজধানীর অপরাধীদের আস্তানা খ্যাত বস্তিগুলোর তথ্য এখনও সংগ্রহ করতে পারেনি পুলিশ। এসব মানুষের না আছে জাতীয় পরিচয়পত্র, না আছে জন্ম-নিবন্ধনের সনদ। তারা ফরম পেলেও তা পূরণ করে জমা দেওয়ায় গুরুত্ব দিচ্ছেন না। রিকশাচালক হারেছ থাকেন কল্যাণপুর পোড়াবস্তিতে। কয়েকদিন আগে ঢাকায় এসেছেন। তিনি এ বিষয়ে এখনও জানেন না।
শ্যামপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মো. আব্দুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমার এলাকার ৭০ শতাংশ ফরম পূরণ হয়েছে। ১৫ মার্চের মধ্যে বাকি ফরম পূরণ করে দেওয়া হবে। মানুষের মধ্যে উৎসাহ রয়েছে। এটি একটি ভালো কাজ।
এদিকে, শনিবার ডিএমপির মাসিক অপরাধবিষয়ক সভা কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, সব পুলিশ কর্মকর্তাকে তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে আরও জোর দিতে বলেছেন বলে সভায় উপস্থিত গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে ডিএমপির সব থানার ওসিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাসিন্দাদের তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে কমিশনার নির্দেশনা দিয়েছেন।
/এমএনএইচ/