উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৮১ মিলিয়ন ডলার হাতিয়ে নিয়েছে হ্যাকাররা। আরও প্রায় ৮ কোটি ডলার হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল তারা। কিন্তু বানান ভুলের কারণে তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
সাইফুরসের বিজ্ঞাপনে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, ইংরেজি বানান ভুলের কারণে হ্যাকাররা চুরিতেও ব্যর্থ হয়েছেন, তাহলেই বুঝুন ইংরেজি শিক্ষার গুরুত্ব কতটুকু! তাই অন্যান্য পেশার পাশাপাশি দক্ষ হ্যাকার হতে হলেও ভালো ইংরেজি জানা খুবই জরুরি।
এ নিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে নিজেদের পক্ষে সাফাই গাইলেন, তারপর দোষ চাপালেন নিজের অফিসের বিজ্ঞাপন সেকশনের প্রতি, তারপর তিনি দোষ দিলেন বিজ্ঞাপন প্রকাশকারী পত্রিকার বিরুদ্ধে। এরপর দাওয়াত দিয়ে তাদের অফিসে গিয়ে সামনাসামনি কথা বলতে বললেন সাইফুরসের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার আনজাম আনসার। তিনি বললেন, ‘সামনাসামনি কথা বললে অনেক কিছু বুঝিয়ে বলা সম্ভব হবে।’
পত্রিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনটিতে দেখা যায়, সেখা লেখা হয়েছে- ইংলিশের ভুলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬০ কোটি টাকা হ্যকারদের হাতছাড়া। বিবিসিকে উদ্ধৃত করে সেখানে লেখা রয়েছে, হ্যাকিংকৃত ডলার শ্রীলংকাতে স্থানান্তরের সময় Foundation শব্দকে Fandation লেখাতে বিদেশি Deutsche ব্যাংকের সন্দেহ হয়। তারা বাংলাদেশ ব্যাংককে জানালে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই ২০ মিলিয়ন ডলার স্থানান্তর বন্ধ করে দেয়।
তারপরে লেখা রয়েছে- একইভাবে ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে DU, JU, CU, RU প্রভৃতি ভার্সিটিতে ভর্তি, BCS, JOB, MBA, IELTS প্রভৃতিতে সাফল্য হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে হাজারো ছাত্রের!!!
অধিকন্তু, ভার্সিটির সব টেক্সট (পাঠ্য) বই হলো English এ। তার মানে দক্ষ ডাক্তার, Engineer, MBA অফিসার, LAWYER (এমনকি দক্ষ হ্যাকার!) প্রভৃতি হতে হলে reading, রাইটিং, Speaking, লিসেনিং ও Spelling সবকিছুতে ভালো হওয়া জরুরি!
এরপর রয়েছে সাইফুরসের সব ঠিকানা। দেশের একটি জাতীয় দুর্ঘটনাকে এভাবে বিজ্ঞাপনের পুঁজি করায় ক্ষুব্ধ, হতবাক অনেকেই।
ফেসবুকে বিজ্ঞাপনটি নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, দক্ষ হ্যাকার্স তাহলে সাইফুর্স বানায়! এই কোচিং বন্ধ করার সময় চলে এসেছে।
সাইফুরসের বিজ্ঞাপন নিয়ে সুইডেন থেকে শিক্ষক আমিনুল ইসলাম লিখেছেন, ঠিক একইভাবে ইংরেজিতে দুর্বলতার কারণে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রামসহ নামি দামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর। তাই তারা সবাইকে সাইফুরসে ভর্তি হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। চিন্তা করে দেখুন অবস্থা! এরা ছাত্র ছাত্রীদের পারলে ব্যাংক ডাকাত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করছে! তবে আমি সব চাইতে বেশি আতঙ্কিত হয়েছি ওই বিজ্ঞাপনের একদম নিচের দিকে দেয়া একটা তথ্য দেখে। সেখানে লেখা আছে- একমাত্র ভার্সিটি ভর্তি কোচিং সেন্টার, যেটা চালাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক!
এই তথ্য পাওয়ার পর আতঙ্কিত হওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। দেশের সব চাইতে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে সব চাইতে মেধাবীরা গিয়ে ভর্তি হয়; সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন প্রাক্তন শিক্ষক চালাচ্ছেন এমন একটা কোচিং সেন্টার, যেখানে কিনা বলা হচ্ছে- হ্যাকারদের মতো ইংরেজি ভালো মতো না জানলে ছাত্রছাত্রীদেরও জীবন শেষ হয়ে যেতে পারে!
আমি আজীবন জেনে এসেছি, চুরি করা, ডাকাতি করা, হত্যা ,ধর্ষণ এই জাতীয় বিষয়গুলো থেকে বিরত থাকার জন্য ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা এতোই নিচে নেমে গেছে যে, এখন হ্যাকারদের মতো চোরদেরকে রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে! তাও আবার একজন প্রাক্তন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে।
আমিনুল ইসলাম নামের আরেকজন লিখেছেন, আমার কাছে মোটামুটি সাইফুরসের সব বই আছে, যখন মন খারাপ থাকে তখন বিজ্ঞাপনগুলো পড়ি, মন ভালো হয়ে যায়। যেমন- একটা বিজ্ঞাপন হচ্ছে, সাইফুরসে ভর্তি হওয়া মানে, এক পা সাইফুরসে অন্য পা IBU-DU তে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাংবাদিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, বানান ভুল হওয়ার কারণে বাংলাদেশের টাকা হ্যাকাররা নিতে পারেনি। তাহলে কি সাইফুরস হ্যাকার বানাতে চাচ্ছে? সব জায়গায় ব্যবসা করতে চাইছে সাইফুরস। কিন্তু তাই বলে এভাবে এই বিজ্ঞাপন দিয়ে।
সাইফুরসের সিইও আনজাম আনসার বাংলাট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওখানে লেখা রয়েছে যেটাতে আপনি ভালো হতে চান, ইংরেজিতে ভালো হতে হবে। ওখানে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, লইয়ার সবইতো লেখা আছে। যেই বিষয়েই দক্ষ হতে চান সাইফুরস থেকে ইংরেজি শিখে নিন।’
তবে এমনকি দক্ষ হ্যাকার তৈরিতেও আপনাদের থেকে ইংরেজি শিখতে হবে এটা দিয়ে কী বোঝাতে চাইলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দক্ষ হ্যাকারের পরে একটা বিস্ময়বোধক চিহ্ন রয়েছে- এটা দিয়ে আমরা আসলে বিষয়টাকে টিজ করতে চেয়েছি, বিষয়টিকে ইজি করতে চেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘অন্য কোনওটার ক্ষেত্রে বিস্ময়বোধক চিহ্ন নেই। কিন্তু এখানে আছে- মানে হলো আমরা টিজ করছি। ব্যাপারটি হলো এমন যে, কেউ যদি খারাপ কিছুতেও দক্ষ হতে হয় সেক্ষেত্রেও ইংরেজি প্রয়োজন।’
‘দক্ষ হ্যাকার’ শব্দটি কেন ব্যবহার করতে হলো- জানতে চাইলে আনজাম আনসার বলেন, ‘ঘটনাটা হলো, শব্দের ভুলে যে হ্যাকিং হলো আমরা সেটি বোঝাতে চেয়েছি।’
কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা হ্যাক হওয়াটা আমাদের জন্য একটি নেগেটিভ বিষয় বললে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই নেগেটিভ। আমরা নেগেটিভ বিষয় থেকে পজেটিভ বিষয়টাকে বের করে আনতে চেয়েছি বিজ্ঞাপন দিয়ে। ইংরেজি শিখলে সেটা সবার জন্য ভালো এই বিষয়টাই আমরা বোঝাতে চেয়েছি।’
কিন্তু এখানে ‘দক্ষ হ্যাকার’ শব্দটি কেন ব্যবহার করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না না না, অ্যাডগুলোতো আমরা বানাই না, অ্যাড বানায় আমাদের আলাদা ডিপার্টমেন্ট।’
এরপর তিনি বলেন, ‘প্রথম আলোতো ছাপিয়েছে, আপনারা প্রথম আলোর সঙ্গেও এটা নিয়ে কথা বলতে পারেন। তারা খুবই চুজি এ বিষয়ে।’
কারা এই বিজ্ঞাপন বানিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের অফিস থেকেই বিজ্ঞাপন বানায় ম্যাম। এটার জন্য নির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করা ঠিক হবে না, আমাদের অ্যাড ডিপার্টমেন্ট বানিয়েছে এটা।’
কিন্তু আপনি চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার হিসেবে কী বলবেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ওপরে এমডি রয়েছেন, চেয়ারম্যান রয়েছেন, আমি একা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।’
কিন্তু আপনার অবস্থান থেকে আপনি এটা নিয়ে কী বলবেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে ফোনে কিছু বলতে চাচ্ছি না, আপনি যদি আমার অফিসে আসেন তাহলে আমরা কথা বলি, সেটা বেটার হয়। আপনি আসেন অফিসে আমরা কথা বলি প্লিজ।’
/এজে/