বাড়িতে ঢুকে নিচতলাতেই একটি ফ্ল্যাটের দরোজার সামনে অনেক জোড়া জুতো দেখে বুঝে নিতে অসুবিধা হলো না এটাই শতাব্দীর বাসা। ভেতরে ঢুকতেই দেখা আরও কয়েকটি গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে। সবাই এসেছেন জানতে, কবিতায় পড়া ভয় কাতুরে মাহবুবের মতো কী করে শতাব্দী এত সাহসী কাজ করল। তবে শতাব্দী বলল, সেতুমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সময়ে, সেদিনই মিডিয়ায় আমাকে নিয়ে আলোচনাতেও আমার কিছু মনে হয়নি, কিন্তু পরদিন যখন দেখলাম আমার জন্য বাস দাঁড়িয়ে আছে, তখন মনে হলো, আমি বোধহয় কিছু একটা করেছি। একইসঙ্গে জানালেন, শুধু এই এলাকার জন্যই না, আমি চাই পুরো ঢাকা, পুরো বাংলাদেশের ছাত্রী-কর্মজীবী নারীদের জন্য কমপক্ষে হলেও যেন পঞ্চাশটি বাস বরাদ্দ করা হয়। এই আবেদন আমার প্রধানমন্ত্রী এবং যোগাযোগমন্ত্রীর কাছে। কোনও রাস্তায় নারীদের বাসে তুলতে কেউ যেন ইগনোর না করেন, রিজেক্ট না করেন, সেই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতেও তাদের আমার অনুরোধ জানাই।
মন্ত্রীকে প্রশ্ন করার মতো সাহস কিভাবে পেলে—জানতে চাইলে শতাব্দী কিছুক্ষণ ভেবে বলে, সবাই এটা জিজ্ঞেস করছেন।
আসলে প্রতিদিন দুর্ভোগ আমাকে আমাকে সাহসী করে তুলেছে। স্কুল ছুটি হয় ১২টায়, কিন্তু প্রতিদিন যে কী পরিমাণ দুর্ভোগ আমাদের পোহাতে হয়, সেটা কেবল আমরাই জানি। বাসগুলোয় উঠতে গেলে আমাদের বলা হয়, মহিলা সিট নেই, আপনারা দাঁড়িয়ে যেতে পারবেন না, আবার নানা রকম অপ্রীতিকর অবস্থার কথা নাইবা বললাম। আমাদের জায়গায় তারা পুরুষদের ওঠাতেন বাসে। এই দুর্ভোগ, এই কষ্টের কারণে সাহস পেয়েছিলাম। আমার একদমই ভয় লাগেনি।
শ্যাওড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে এমইএস পর্যন্ত এই বাস সার্ভিস চালু হয়েছে।কেবল নারীদের জন্য একটা বাস দাঁড়িয়ে থাকবে, আমার এটা ভেবেই ভালো লাগে। সব বন্ধুরা, শিক্ষকরা আমাকে নিয়ে কথা বলছে, তারা আমাকে নিয়ে এক্সাইটেড। আমরা বন্ধুরা বলছে তারা আমার জন্য প্রাউড ফিল করছেন। কারণ আমার সেদিনের কথার জন্যই এখন তারা খুব ভালোভাবে বাসে করে যাতায়াত করতে পারছেন, এমনকি যারা অভিভাবক রয়েছেন, তারাও আমাকে অভিনন্দিত করছে। আমার আত্মীয়-স্বজন সবাই পত্রিকা টিভিতে আমাকে দেখে ফোন করে কথা বলছে। যেখানে আগে একটা বাসে পাঁচ থেকে ছয়জন মেয়ে উঠতে পারতেন, সেখানে আজ ৫২ সিটের বাসে ৫২ জন নারী শিশু ছাড়াও দাঁড়িয়েও যাবেন অনেক নারী। এটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি উল্লসিত করছে। কয়েকজনের কষ্টতো লাঘব করতে পেরেছি।এটাই অনেক।
শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টেনমেন্ট স্কুলে দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী শতাব্দী। ব্যবসায়ী বাবা শফিকুজ্জামান আর মা শিক্ষক আকলিমা তরফদারের দুই মেয়ের মধ্যে শতাব্দী বড়।
মা আকলিমা তরফদার জানালেন, পঞ্চম ও অস্টম শ্রেণিতে জিপিএ ফাইভ পেয়েছিল শতাব্দী। ছোট মেয়েটা খুব দুষ্ট হলেও শতাব্দী খুবই শান্ত এবং নরম মনের। চার বছর বয়স থেকে গান শিখেছেন, রবীন্দ্রসংগীত খুব ভালো গায়।
শতাব্দী বলে, আমিতো খুব সাধারণভাবেই ওনাকে প্রশ্ন করেছি, উনি যেহেতু যোগাযোগমন্ত্রী, তাই আমার মনেই হয়েছিল, উনিই এটার একটা ব্যবস্থা করতে পারবেন। কিন্তু আমি এখন বুঝতে পারছি না, মিডিয়া কেন এটাকে এত ফলাও করে প্রচার করছে। খুব আশ্চর্য লাগছে আমার। আমি তো অমানবিক কিছু করিনি, খুব সাধারণ একটা কাজ করেছি। স্কুলে আসতে-যেতে অনেক সমস্যায় পরতে হতো, মনে ক্ষোভ ছিল, দুঃখ ছিল, কষ্ট ছিল। তাকে সামনে পেয়ে তাই প্রশ্ন করেছি। এটা কি অনেক বড় কিছু? তবে, আমার মতো একজন সাধারণ মানুষের কথা রাখায় মন্ত্রীর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
রবিবার বাংলাদেশ-ওমান খেলা এবং তামিমের সেঞ্চুরি নিয়ে উচ্ছ্বলিত শতাব্দী বোলিং এ মাশরাফি-তাসকিন আর ব্যাটিংয়ে মুশফিক-সাব্বিরের ভক্ত। বলেন, মুশফিক কি সুন্দরভাবে ঠাণ্ডা মাথায় খেলে যায়, সবারই উচিত, যে কোনও কঠিন সময়ে মাথা ঠাণ্ডা রেখে নিজের কাজ করে যাওয়া।
শতাব্দীর মা আকলিমা তরফদার বলেন, আমার মেয়েকে আমি অনেক বড় দেখতে চাই, মেয়ে যেন দেশের সেবা করতে পারে। মায়ের মুখের কথা কেড়ে শতাব্দী জানাল, নিজের টাকায় পড়তে যাব না, স্কলারশিপ নিয়ে পড়ে দেশে ফিরে আসব, বড় চিকিৎসক হব, বিনামূল্যে তাদের চিকিৎসা দেব।
ফিরে আসার সময় শতাব্দী বলল, এই রুটে নারীদের জন্য একটা বাসের কত প্রয়োজন ছিল সেটা আজকের ঘটনাতেই বোঝা যায়। আজ শতাব্দী নিজেই বাসের সিট পায়নি একটু দেরি হওয়াতে। তবে আমাকে দেখে ছাত্রীরা তো বটেই অভিভাবকরা সিট ছেড়ে দেন। কিন্তু আমি বসিনি, দাঁড়িয়ে গিয়েছি, আমি এতেই খুশি।
/এমএনএইচ/