আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি: জিতে গেল তামাক কোম্পানি!

তামাক বিরোধী প্রচারণাকথা ছিল, সিগারেটের প্যাকেটের ওপরের ৫০ শতাংশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইনমন্ত্রণালয় মত দিয়েছে বার্তাটি থাকবে প্যাকেটের নিচের অংশে। তাই শেষঅব্দি সিগারেট কোম্পানিই জয়ী হলো। স্বাস্থ্য সচেতনতা আমলে নিল না সরকার।

অথচ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন শীর্ষক  সাউথ এশিয়ান স্পিকারর্স সামিট এর সমাপনী দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের বিধি অনুসরণ করে তামাকজাত পণ্যের মোড়কে ছবি সম্বলিত সতর্কবার্তা সংযোজন করার ঘোষণা প্রদান করেন। একইসঙ্গে গত ১২ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেছিলেন,প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে তামাকমুক্ত করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়, আইনমন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের একসঙ্গে কাজ করা জরুরি। তিনি বলেছিলেন, আগামী ১৯ মার্চ থেকে সব তামাকপণ্যের প্যাকেটের ওপরের ৫০ শতাংশেই সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নোটিশ দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে। 

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল ১৩ মার্চ সকালে এ সর্ম্পকিত ফাইলে স্বাক্ষর করে ব্যাক্তিগত সফরে দেশের বাইরে গিয়েছেন বলে জানিয়েছে বিশ্বস্ত সূত্র।

আবার আইনমন্ত্রীর অনুমোদনের আগের দিনই অর্থ্যাৎ গত ১২ মার্চ বাংলাদেশ সিগারেট ম্যানুফেকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমএ) ও ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) সিগারেটের প্যাকেটের গায়ের নিচের দিকের ৫০ শতাংশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী সম্বলিত পোস্টার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তামাকেবিক্রেতাদের কাছে দেখা গেছে, যেটা আইন মন্ত্রণালয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মন্তব্য সংশ্লিষ্টদের।


সিগারেটের নতুন প্যকেটনাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র বাংলা ট্রিবিউনকে জানায়, আইনমন্ত্রী দেশে ফিরবেন আগামী ২০ মার্চ। তার আগের দিন ১৯ মার্চ  হচ্ছে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা মুদ্রণের নির্ধারিত শেষ দিন।সূত্রটি জানায়, সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা নিয়ে কোনও কথা না বলতেই আইনমন্ত্রীর এ বিদেশযাত্রা।

জানতে চাইলে তামাক বিরোধী সংগঠন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন,আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে তামাক কোম্পানির সখ্যতা নতুন নয়। এর আগে তামাক কোম্পানির পরামর্শ অনুযায়ী নানা যুক্তি, নানা অজুহাতে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) এর বিধিমালা চূড়ান্ত করতে দুই বছর সময় নিয়েছিল আইন মন্ত্রণালয়।

ওয়ার্ক ফর বেটার বাংলাদেশ (ডব্লিইউবিবি) এর মতে, এই আইন এবং বিধিমালার ভেটিং করেছে আইন মন্ত্রণালয় নিজেই। আইন বাস্তবায়নের শেষ সময়ে এসে তামাক কোম্পানিগুলো মরিয়া হয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটে স্টাম্প এবং ব্যান্ডরোল লাগানোর নির্দেশনা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের ১০ নং ধারার সাথে সংঘর্ষপূর্ণ বিধায় তারা এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামত জানতে চায়। তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ও এর বিধি অনুযায়ী সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী তামাকপণ্যের প্যাকেটের উভয় পার্শ্বে উপরিভাগের ৫০ শতাংশে এমনভাবে মুদ্রণ করতে হবে যাতে তা স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল দ্বারা ঢেকে না যায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ সংক্রান্ত এক চিঠির জবাবে আইন মন্ত্রণালয় তামাক কোম্পানির পক্ষে মত দেয়।

 উল্লেখ্য, তামাকের ব্যবহার নিরুৎসাহিতকরণে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর গুরুত্ব সারাবিশ্বে স্বীকৃত।‘তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইন, ২০১৩’ ও এর বিধিমালা, ২০১৫ অনুযায়ী আগামি ১৯ মার্চের মধ্যে সব ধরণের  তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট, মোড়ক, কার্টন বা কৌটার দুপাশে, উপরিভাগে ৫০ শতাংশ জায়গা জুড়ে রঙ্গিন ছবি ও লেখা সম্বলিত স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মুদ্রণ করা বাধ্যতামূলক রয়েছে।

সিগারেট বা অন্যান্য তামাকের ভয়াবহতায় বিশ্বের অনেক দেশেই তামাকজাত পণ্যের প্যাকেটে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা সংযোজন করেছে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানরা। ভারতে সিগারেটের প্যাকেটের মোড়কের সামনে এবং পেছনে ৮৫ শতাংশ স্থান জুড়ে সচিত্র সতর্কবার্তা সংযোজন করার আইন হয়েছে। সিগারেটের প্যাকেটের মোড়কে সতর্কবার্তার জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে নেপালে  ৯০ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৮৫ শতাংশ, অস্ট্রেলিয়ায় প্যাকেটের সামনে ৭৫ শতাংশ এবং পেছনে ৯০ শতাংশ, শ্রীলংকায় সামনে পেছনে ৮০ শতাংশ। এমনকি ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত ২৮টি দেশও সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে ৬৫ শতাংশ স্থান জুড়ে সচিত্র স্বাস্থ্যবার্তা জুড়ে দিয়েছে।

এদিকে,তামাক বিরোধী ১২টি সংগঠন- ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন, এসিডি, ইপসা, সীমান্তিক, উবিনীগ, ইসি বাংলাদেশ, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, নাটাব, প্রত্যাশা, এইড ফাউন্ডেশন ও প্রজ্ঞা তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেটে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী বিধিমালা অনুযায়ী মোড়কের উপরের ৫০ শতাংশে সতর্কবাণী বাস্তবায়নের দাবিতে তিন দিন ব্যাপী রোডশো শুরু করেছে আজ। আগামী ১৬ মার্চ বুধবার দুপুর ১২ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন আয়োজনের মধ্যদিয়ে এই কর্মসূচি সমাপ্ত হবে।

এপিএইচ/