এই কার্যক্রমের মধ্যে কেবল আপিলের রায় রিভিউয়ের সুযোগ আছে। ১৫ দিনের মধ্যে আপিলের আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ করতে হবে। রিভিউ শুনানি শেষ হতে যেটুকু সময়। এখন পর্যন্ত যে কয়েকটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে তার কোনওটিতেই রিভিউয়ে দণ্ডের কোনও হেরফের হয়নি।
মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে ১৫৩ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। চূড়ান্ত আপিলের রায়ে তিনটি অভিযোগে নিজামীর মৃত্যুদণ্ড, তিনটিতে খালাস, দুটিতে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। রায়ে বলা হয়, ‘আপিল আংশিক মঞ্জুর করা হলো। আপিলকারী মতিউর রহমান নিজামীকে অভিযোগ নম্বর ১, ৩ ও ৪ থেকে খালাস দেওয়া হলো। অভিযোগ নম্বর ২, ৬, ৭, ৮ ও ১৬ এর ক্ষেত্রে দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড বহাল রাখা হলো।
৭২ বছর বয়সী নিজামী তখন গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে। বিগত চার দলীয় জোট সরকারের এই মন্ত্রী চট্টগ্রামের চাঞ্চল্যকর দশ ট্রাক অস্ত্র মামলারও মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আসামি। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিতদের মধ্যে নিজামী হলেন ষষ্ঠ ব্যক্তি, আপিল বিভাগে যার মামলার নিষ্পত্তি হলো।
রায় প্রকাশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছে। আসামিপক্ষ ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে পারবে। রিভিউ আবেদন না হলে আইন অনুযায়ী রায় কার্যকর হবে। রায়ের কপি ট্রাইব্যুনালে পৌঁছালে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুপরোয়ানা জারি করবেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পরবর্তীতে রিভিউ শুনানি হলে পরোয়ানা স্থগিত হয়ে থাকবে। রিভিউ খারিজ হলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর প্রক্রিয়া ফের শুরু হবে। সেক্ষেত্রে সর্বশেষ সুযোগ হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে অপরাধ স্বীকার করে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন আসামি। প্রাণভিক্ষার আবেদন না করলে কিংবা আবেদন করার পর নাকচ হয়ে গেলে চূড়ান্তভাবে ফাঁসি কার্যকর করা হবে।’
এদিকে নিজামীর আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, ‘রায় পাওয়ার পর আসামির সঙ্গে পরামর্শ করে রিভিউ আবেদন করা হবে।’
এর আগে গত ৬ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ বুধবার সকালে এক মিনিটের মধ্যে দুটি বাক্যে এই রায়ের সংক্ষিপ্তসার জানিয়ে দেন। বেঞ্চের অপর তিন সদস্য হলেন- বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
২, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে পাবনার বাউশগাড়ি, ডেমরা ও রূপসী গ্রামের প্রায় সাড়ে ৪০০ মানুষকে হত্যা ও ৩০-৪০ জন নারীকে ধর্ষণ; পাবনার ধুলাউড়ি গ্রামে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৫২ জনকে হত্যা এবং পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবী গণহত্যার দায়ে নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল রাখা হয়েছে। আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা বহাল রাখা হয়েছে ৭ ও ৮ নম্বর অভিযোগে হত্যায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে ৪ নম্বর অভিযোগে নিজামীর মৃত্যুদণ্ড এবং ১ ও ৩ নম্বর অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও আপিল বিভাগ এসব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দিয়েছেন।
জামায়াতের আমির নিজামী একাত্তরে ছিলেন দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নাজিমে আলা বা সভাপতি এবং সেই সূত্রে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য গঠিত আল বদর বাহিনীর প্রধান।
এর আগে বিভিন্ন মামলায় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের দক্ষতা নিয়ে সমালোচনা হলেও আপিল বিভাগে নিজামীর ফাঁসি বহালের রায়কে নিজেদের অর্জন হিসেবেই দেখেন প্রসিকিউশন দলের অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে যে জঘন্য অপরাধ করেছিল এবং অপরাধ করতে নির্দেশ দিয়েছিল তার জন্য ফাঁসি ছাড়া অন্য কোনও শাস্তি হতে পারে না। আমরা সন্তুষ্ট।’
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পর গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার তা দ্রত কার্যকরের কথা উল্লেখ করে বলে, ‘মতিউর রহমান নিজামীর মতো ঘৃণ্য রাজাকারের ফাঁসির আদেশ দ্রুত কার্যকরের ব্যবস্থা নেওয়া হোক। দীর্ঘদিন ধরে এরা যুদ্ধাপরাধী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা লাগানো গাড়িতে চড়ে ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। আর কোনও সুযোগ তাদের দেওয়া যাবে না।’
/এজে/ আপ-এমএসএম