মামলা করে আয় করবেন যেভাবে

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরযেকোনও দোকান, হোটেল বা ফাস্টফুডের দোকানে মোড়কজাত পণ্যের গায়ে লেখা দামের চেয়ে বেশি দাম নিলে ভোক্তাদের মামলা করার সুযোগ রয়েছে। যেকোনও ভোক্তা চাইলেই জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে এ সংক্রান্ত অভিযোগ করে জরিমানার ২৫ ভাগ অর্থ পেতে পারেন। ভোক্তাদের স্বার্থে সরকারের এই প্রতিষ্ঠানটি এ নিয়ে কাজ করছে। তবে সম্প্রতি অভিযোগ মিলেছে, গ্রাহকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ধীর গতিতে এগোচ্ছে ভোক্তা অধিদপ্তর। এ বিষয়ে ভোক্তাদের অভিমত, অভিযোগের পর ব্যবস্থা গ্রহণে বিলম্ব গ্রাহকদের পিছিয়ে দেবে। সেক্ষেত্রে লাভবান হবেন অসৎ ব্যবসায়ীরা।

কেন অভিযোগ করবেন

মোড়কজাত পণ্যের মূল্য যেকোনও বিক্রেতা বেশি রাখলেই অভিযোগ করা যাবে। ভোক্তা হিসেবে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই অভিযোগ করা উচিত। সেক্ষেত্রে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট দোকান থেকে ম্যামো গ্রহণ করবেন। বিক্রেতাকে পণ্যের পরিমাপ ও বেশি রাখা মূল্যটি ম্যামোতে লিখতে বলতে হবে। যেমন: একটি ৫০০ মিলিলিটার পানির বোতলের গায়ের দাম ১৫ টাকা। এক্ষেত্রে কোনও ফাস্টফুড বা রেস্টুরেন্টে দাম ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০ টাকা রাখা হলে গ্রাহক হিসেবে বিক্রেতার কাছে ম্যামো চাইতে হবে। বিক্রেতা তা দিতে অস্বীকৃতি জানালেও সেটি গ্রহণ করতে হবে। অর্থাৎ গায়ের দামের চেয়ে বেশি রাখলেই ম্যামো নিতে হবে। এরপর এই ম্যামোসহ ভোক্তা অধিদপ্তর বরাবর অভিযোগ দায়ের করতে হবে। অবশ্যই, ম্যামোর ফটোকপি ও অভিযোগপত্রের ফটোকপি গ্রাহককে সংরক্ষণ করতে হবে। এরপর গ্রাহককে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে, কবে কোথায় অভিযোগের ভিত্তিতে শুনানি হবে। সে শুনানিতে একজন ম্যাজিস্ট্রট থাকবেন। তিনি জরিমানা আদায় করে অভিযোগকারী গ্রাহককে তার ২৫ ভাগ দেবেন। তবে শুনানিতে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উপস্থিত না হলে ম্যাজিস্ট্রেট যেকোনও আইনি ব্যবস্থা নিতে পারেন। সেক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠান থেকে সতর্ক করা হবে।

যেভাবে অভিযোগ করা যাবে
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী- ভোক্তার সঙ্গে প্রতারণা, ভেজাল দেওয়া, মোড়কে তথ্য না থাকা, মিথ্যা তথ্য দেওয়া, সেবায় প্রতারণা করা, প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করাসহ ১৭টি কর্মকাণ্ডকে অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে। এসব অপরাধের শিকার হলে যেকোনও ভোক্তা আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন। এ জন্য জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরে লিখিত আবেদন করতে বলা হয়েছে। আবেদনে অভিযোগকারীর নাম, ঠিকানা, বাবা-মায়ের নাম, ফোন/ফ্যাক্স/ই-মেইল নম্বর ও পেশা উল্লেখ করতে হবে। অভিযোগ পাঠানোর ঠিকানা- মহাপরিচালক, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ১, কাওরানবাজার (টিসিবি ভবন- অষ্টম তলা), ঢাকা। প্রত্যেক জেলায় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছেও একইভাবে আবেদন করা যাবে।

এ ব্যাপারে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আবুল হোসেন মিঞা বলেন, ‘আইনের মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে কাজ করছে অধিদফতর। আমি বলবো, আমাদের ৮০ শতাংশ সফলতা এসে গেছে। অধিদফতরে সুযোগ্য লোকবল কাঠামো নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। এখন ভোক্তা সাধারণকে সচেতনতার সঙ্গে এ সুযোগ নিতে হবে।’

গ্রাহক অভিযোগে ব্যবস্থা গ্রহণে ধীর গতি ভোক্তা অধিদপ্তরের
অভিযোগ পাওয়া গেছে ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ গেলেও ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ধীর গতিতে এগোচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এক্ষেত্রে গ্রাহকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। পাশাপাশি অসৎ ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করছে। এছাড়া মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় রাজধানীর অনেক হোটেল, ফাস্টফুড ও রেস্টুরেন্টে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি রাখার অভিযোগ আসছে।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী জানি অভিযোগ করেন, বিগত দুই মাসে তিনি তিনটি অভিযোগ দায়ের করলেও এ নিয়ে কোনও ব্যবস্থা নেয়নি ভোক্তা অধিদপ্তর। একই অভিযোগ করেন মিরপুরের এক অধিবাসী। নাম প্রকাশ করতে না চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমার দুইটি মামলার কোনও ফলোআপ নেই।’

এদিকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের বিরতি রেস্টুরেন্টেও গ্রাহকদের কাছ থেকে মূল্য গ্রহণে ব্যাপক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ করেছেন ওবায়দুল্লাহ নামে একজন ক্রেতা। তিনি বলেন, ‘গত ১১ মার্চ শুক্রবার ওই রেস্টুরেন্টে কোমল পানীয় ফানটার গায়ের দাম ১৫ টাকা হলেও বোতলপ্রতি ১০ টাকা বেশি রাখা হয়। এরপর তিনি এ নিয়ে রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষকে অভিযোগ করলেও তারা কর্ণপাত করেননি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ কনজ্যুমারস ক্লাব বিসিসির সভাপতি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ ব্যবসায়ীদের মধ্যে নৈরাজ্য সৃষ্টি করবে। ভোক্তার অভিযোগের ভিত্তিকে কাজ না করাটা অন্যায়। আমার মনে হয়, ভোক্তা অধিদপ্তরের কাজ হবে অভিযোগকারীদের অভিযোগ আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এতে করে গ্রাহক হয়রানি, প্রতারণা অনেক কমবে।’

এ নিয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আবুল হোসেন মিঞাকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের সদিচ্ছার অভাব নেই। অভিযোগ কেন্দ্র অভিযোগ পাওয়া সাপেক্ষে চিঠি ইস্যু করে। এরপর আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করি। এক্ষেত্রে একটু সময় প্রয়োজন হয়। এছাড়া সম্প্রতি ভোক্তা অধিদপ্তর দিবস যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানের ব্যস্ততা একটু বেশি ছিল।’

তিনি আরও জানান, গ্রাহকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিষ্ঠান কাজ করে যাচ্ছে।

এসটিএস/এজে/