৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত দৃশ্যমান। ভারতের ত্রিপুরা, কলকাতা, মুম্বাইয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের বাংলাদেশ মিশনে হামলা বা মিছিল নিয়ে যাওয়া, দিল্লি বা পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নেতিবাচক উক্তি, ওই দেশের মিডিয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এর প্রতিক্রিয়ায় সরকার, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান প্রতিবাদ করছে।
এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে বৈঠক হতে যাচ্ছে আগামী ৯ ডিসেম্বর। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীমউদ্দিন এবং ভারতের পক্ষে বিক্রম মিসরি। উল্লেখ্য, দুজনই চীনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।
আপাত দৃষ্টিতে ওই পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক শুধু আনুষ্ঠানিকতা হলেও এর গুরুত্ব অনেক বেশি বলে মনে করেন সাবেক কূটনীতিকরা। তাদের মতে, বাংলাদেশে পটপরিবর্তনের পর প্রথম বৈঠকে দুদেশ তাদের রাজনৈতিক দূরত্ব কমানোর বিষয়টিতে জোর দেন। এর কারণ হচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার সুযোগ কম। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিসরির সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক এক কূটনীতিক বলেন, “৫ আগস্টের আগে ও পরে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তনটি রাজনৈতিক। আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতীয় প্রশাসনের রাজনৈতিক বোঝাপড়া ছিল। কিন্তু হঠাৎ বাংলাদেশে পটপরিবর্তনের ফলে গঠিত নতুন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক বোঝাপড়ার অভাব রয়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, যেখানে বাংলাদেশের ‘হিন্দু কার্ড’ ব্যবহার করে বিজেপি বা মমতা ব্যানার্জি সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করছে।”
পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের গুরুত্বের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কূটনীতিতে এর একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। আসন্ন পররাষ্ট্র সচিবদের বৈঠকে বড় ধরনের কোনও কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। কিন্তু দুই পররাষ্ট্র সচিবের ঢাকায় বসে বৈঠকের ছবিটি একটি বড় বার্তা দেবে।’
রাজনৈতিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ ও ভারত ঐতিহাসিকভাবে সাংগঠনিকভাবে যুক্ত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারতের যেমন বাংলাদেশকে দরকার এবং উল্টোটাও ঠিক, কারণ দুদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্কে আন্তনির্ভরতা রয়েছে। ভারতে মুসলিমরা এবং বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে যেমন মুসলিমবিরোধী মনোভাব রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেরও কিছু অংশের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব আছে।
শক্তির (পাওয়ার) দিক থেকে বিচার করলে ভারতের অবস্থান চার নম্বরে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বহুপক্ষীয় শক্তির যে উত্থান দেখা যাচ্ছে, সেখানে ভারত একটি উদীয়মান দেশ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়ে একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘কূটনীতিতে দুটি জিনিস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ– একটি হচ্ছে ইতিহাস এবং অপরটি হচ্ছে ভৌগোলিক অবস্থান। এ কারণে যেকোনও দেশ তার প্রতিবেশীকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। কারণ প্রতিবেশীর জন্য একটি দেশের ভালো হতে পারে, আবার সমস্যাও তৈরি হতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সমস্যা তৈরি হওয়ার কারণে বাংলাদেশে বিশাল সমস্যা তৈরি হয়েছে। আবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য ভারত থেকে সহজে আমদানি করা সম্ভব হয় বা অনেক বাংলাদেশি ভারতে চিকিৎসা করতে যায়।’
দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয় রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের লাভ-ক্ষতি বিশ্লেষণ এবং ঝুঁকি পর্যালোচনা করে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা করতে হবে।’
ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি
আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক বোঝাপড়ার বিষয়টি গোপন কোনও বিষয় নয়। শেখ হাসিনার সরকারের সময়ে ভারত অত্যন্ত স্বস্তিকর অবস্থায় ছিল। হঠাৎ পটপরিবর্তন হওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ভারতের স্বস্তিকর অবস্থান পাল্টে যায় এবং এর কারণে তাদের মনোভাবেও পরিবর্তন দেখা যায়।
দিল্লি প্রথম থেকেই বাংলাদেশে ‘হিন্দু কার্ড’ ব্যবহার করছে, যদিও ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতন ও অত্যাচারের রেকর্ড অত্যন্ত খারাপ। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা হচ্ছে। ভারতীয় মিডিয়ায় বাংলাদেশ নিয়ে অপপ্রচারের কারণে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন তলানিতে।
এ বিষয়ে একজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘অর্থনৈতিক নাজুক পরিস্থিতির কারণে সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ফল তুলনামূলক খারাপ। হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠাকারী হিসেবে নিজেদের জাহির করেও তারা নির্বাচনে ভালো ফল করতে পারেনি। এমনকি খোদ অযোধ্যা, যেখানে তারা রামমন্দির বানিয়েছে, সেখানেও তাদের হেরে যেতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন হচ্ছে–এ ধরনের একটি অপপ্রচার চালানোর মাধ্যমে তারা তাদের হিন্দুত্ববাদ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়।’
ভারতের মিডিয়ায় অপপ্রচারের বিষয়ে আরেকজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে জড়িত পক্ষগুলো মিডিয়াকে এ বিষয়ে ইন্ধন দিচ্ছে। অন্য আরেকটি বিষয় হচ্ছে, এ ধরনের জনতুষ্টিমূলক অপসংবাদ ছাপা হলে, সেটি পাঠকদের কাছে জনপ্রিয়তা পায়।’
বাংলাদেশের কী করা দরকার
ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগের কোনও বিকল্প নেই বাংলাদেশের কাছে। এখন পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির টেলিফোন আলাপ হয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকরের বৈঠক হয়েছে। আগামী সপ্তাহে দুই পররাষ্ট্র সচিবের মধ্যে বৈঠক হবে।
এ বিষয়ে সাবেক আরেকজন কূটনীতিক বলেন, ‘শুধু সরকারি যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ট্র্যাক-২ ব্যবহার করা যেতে পারে। এছাড়া আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মেও যোগাযোগ অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।’
তবে তিনি বলেন, ‘এখন যেটি দরকার সেটি হচ্ছে দুপক্ষের সংযত আচরণ এবং নেতিবাচক মন্তব্য থেকে বিরত থাকা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিকবার বলা হয়েছে ঢাকা ভালো সম্পর্ক চায় এবং সেটি হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে এবং এটিই সঠিক বার্তা।’
ভূ-রাজনীতি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক শুধু দ্বিপক্ষীয় উপাদানের ওপর নির্ভর করে না। ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক অনেকটা নির্ভর করে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক এবং ভারতের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের ওপর।
এ বিষয়ে আরেকজন সাবেক কূটনীতিক বলেন, ‘জটিল ভূ-রাজনীতিতে চীন বর্তমানে দ্বিতীয় শক্তিধর রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দিয়ে প্রথম শক্তি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তার। অন্যদিকে, ভারত একটি উদীয়মান রাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পরিচিত।’
যুক্তরাষ্ট্রের চীনবিরোধী ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের একটি বড় অংশীদার ভারত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারত মহাসাগরকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে যে টেনশন রয়েছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করছে দিল্লি। ফলে জটিল এই সমীকরণের মাঝে বাংলাদেশকে সম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় স্বার্থ উদ্ধার করতে হবে।’