মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতেই জেনেভা ক্যাম্পে সংঘর্ষ

মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে নারীসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন। পুলিশের অভিযানে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে এলেও আবারও বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা করেছেন বাসিন্দারা।

জেনেভা ক্যাম্পে মাদক ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষের পর পুলিশি টহল

বৃহস্পতিবার সকাল ১০ টা থেকে দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়ে দুপুর ১২ টা পর্যন্ত চলে। এর আগে বুধবার রাতেও তাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষের পর বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, জেনেভা ক্যাম্পের ভেতরে সাত নম্বর সেক্টরের জি-ব্লকের আল-ফালাহ হাসপাতালের পাশের গলিতে ভাঙা ইটের স্তূপ পড়ে আছে। গলিতে থাকা সব দোকান বন্ধ। কয়েকটি দোকানে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বাসিন্দারা সবাই বাসার ভেতরে। কেউকেউ বের হলেও আতঙ্ক বিরাজ করছে তাদের মধ্যে। ওই গলিতে জিয়া নামে এক সিএনজি চালকের সঙ্গে দেখা হয়। তিনি জেনেভা ক্যাম্পেই থাকেন।

জিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে হঠাৎ নাদিম ও আনোয়ার গ্রুপের ছেলেরা হামলা চালায়। তারা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এর আগে বুধবার রাত ১০ টার দিকেও একবার হামলা চালিয়েছিল।’

কি জন্য হামলা চালিয়েছে জানতে চাইলে জিয়া বলেন ‘মাদকের ব্যবসা। তারা ওপেন মাদক বিক্রি করবে কেউ কিছু বলতে পারবে না। বললেই মারধর করবে।’

কারা মাদক ব্যবসা করে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,‘এখানে সবাই জানে কারা করে। পুলিশও জানে। নাম বললে আমাদের সমস্যা হবে। আমাকে মেরেও ফেলতে পারে। আপনি নেতাদের কাছে জানতে চান। পুলিশের কাছে জানতে চান। পুলিশ সব জানে। কমিশনার সব জানে। তারা মাসে মাসে টাকা পায়।’

গলির সামনের দিকে এগিয়ে গেলেই দেখা যায় জুয়েল নামে এক পেঁয়াজ বিক্রেতার দোকান পুড়িয়ে দিয়েছে হামলাকারীরা।জুয়েল ও তার স্ত্রী দোকানের পোড়া পেঁয়াজ পরিষ্কার করার চেষ্টা করছিলেন। জুয়েল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘হামলাকারীরা পেট্রোল দিয়ে দোকানে আগুন দেয়। আমরা প্রাণের মায়ায় দৌড়ে পালিয়েছি। শান্তি গ্রুপের নাদিম, আনোয়ার, পলু, সিমা, আরিফ, আশরাফ ও জাহাঙ্গীর হামলা চালায়। তারা ক্যাম্পের ভেতরে মাদক ব্যবসা করতে চায়।আমরা নিরীহ মানুষ কি করব?’

মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান গোলাম জিলানী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ক্যাম্পের ভেতরে কয়েকটি গ্রুপ মাদকের স্পট চালায়। শান্তি গ্রুপের এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে আনোয়ার। সে ক্যাম্পের ভেতরের কয়েকটি স্পট চালায়। তাদের সঙ্গে বুলু নামে এক মাদক ব্যবসায়ী তাদের সঙ্গে আগে কাজ করত। কিছুদিন ধরে সে আনোয়ারের সঙ্গে কাজ করছে না।নিজেই সাত নম্বর সেক্টরে একটি স্পট খুলছে। এতে শান্তি গ্রুপের লোকজন তার উপর ক্ষেপে যায়। তারা বুধবার রাতে কয়েকবার হামলা চালায়,বৃহস্পতিবার সকালেও আবার হামলা চালায়।’

জেনেভা ক্যাম্পের শাহিদা বেগম নামে এক বৃদ্ধা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাবা নাকি কি খায়? আমি নাম জানি না। ওইটা নিয়া ঝামেলা হইছে। হামলার সময় আমরা দরজা বন্ধ করে ছিলাম।’

খোরশেদ আলম নামে এক ব্যক্তি বলেন,‘ক্যাম্পের সম্রাট হলো মাদক ব্যবসায়ীরা। তারা পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় কমিশনার হাবিবুর রহমান মিজান ও নেতাদের হাত করে নিয়েছে। মাদক ব্যবসায় কেউ বাধা দিলে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে। কারণ পুলিশ টাকা পায়। ক্যাম্পের নেতারাও টাকা পায়। তাই তারা চুপচাপ থাকে। আগে কেউ মাদক বিক্রি করলে গোপনে করত। বর্তমান কমিশনার নির্বাচিত হওয়ার পর খোলামেলা ইয়াবাসহ মাদক বিক্রি হয়।’

তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় কয়েকজন আহত হয়েছে। তবে গরীবের আহত কেউ গোনায় ধরে না। ইটের আঘাত তাদের কাছে সয়ে গেছে। কারণ তারা কথা বললেই তাদের জেলে দেওয়া হবে।’

বুধবার রাতে ও বৃহস্পতিবার সকালে কয়েক দফায় সংঘর্ষ ঘটলেও পুলিশ ক্যাম্পের ভেতরে অভিযান চালাতে দেরি করে।  পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় অভিযান চালানো হয়নি বলে জানানো হয়েছে। হামলাকারীরা সকালের দিকে পুলিশকে লক্ষ্য করেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেছে। এরপর পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করে দুপুরে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) ওয়াহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে বিপুলসংখ্যক চাপাতি, ছুরি, রামদা ও চাকু উদ্ধার করা হয়।

ওয়াহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালিয়ে দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করেছি।পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অপরাধে এই ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হবে।’

/এরআরআর  /এমএসএম/টিএন/