মন্ত্রিপরিষদ থেকে জারি করা এই নির্দেশনার ভূমিকায় বলা হয়েছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহের ব্যবহারের জনপ্রিয়তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বাংলাদেশেও ব্যক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক উভয় পর্যায়ের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারে এ প্রবণতা লক্ষণীয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৮০ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন। অন্যদিকে বর্তমানে দেশব্যাপী আট শতাধিক সরকারি অফিস দাফতরিক কাজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করছে। এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি নির্দেশিকা প্রণয়নের আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে।
নির্দেশিকা জারির উদ্দেশ্য ও ব্যবহার প্রসঙ্গে বলা হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মচারীদের করণীয় ও বর্জনীয় নির্ধারণ করা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা।
নির্দেশিকায় বলা হয়, এ নির্দেশিকাটি সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর, সংস্থা, মাঠ পর্যায়ের সরকারি অফিস, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং গণকর্মচারীদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।
পৃথিবীর জনসংখ্যার ৪২ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। এর মধ্যে ২৯ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত এবং ২৩ শতাংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষেত্রে মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে। অনলাইনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনেকগুলো প্ল্যাটফর্ম রয়েছে, যার অধিকাংশই যে কোনও ব্যবহারকারীর জন্য উন্মুক্ত।
জনপ্রিয় যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে : ফেসবুক, ট্যুইটার, ইউটিউব, স্কাইপি, গুগল প্লাস, ভিমিও, ভাইবার, লিংকডইন, ইন্সটাগ্রাম, পিনটারেস্ট ও হোয়াটসঅ্যাপ।
বর্তমান সময় পর্যন্ত পৃথিবীব্যাপী ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সর্বাধিক। বাংলাদেশেও এ প্ল্যাটফর্মটি তুলনামূলকভাবে বেশি জনপ্রিয়। জনস্বার্থে সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক একাধিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যেতে পারে।
নির্দেশিকায় বলা হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নাগরিক সম্পৃক্তিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের নতুন নতুন সুযোগ তৈরি এবং এসব ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীদের মাঝে একুশ শতকের উপযোগী সক্ষমতা সৃষ্টির জন্য নিম্নবর্ণিত প্রাতিষ্ঠানিক কাজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। যেমন- দাফতরিক যোগাযোগ ও মতবিনিময়, সমস্যা পর্যালোচনা ও সমাধান, জনসচেনতা ও প্রচারণা, নাগরিক সেবা সহজিকরণ ও উদ্ভাবন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ, জনবান্ধব প্রশাসন ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, সেবা গ্রহিতাদের অভিযোগ নিষ্পত্তি ইত্যাদি।
অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থাপনার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচলিত কোনও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করার লক্ষে দাফতরিক অ্যাকাউন্ট তৈরি ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় অনুসরণ করতে হবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- দফতরের অ্যাকাউন্ট, পেইজ, ব্যানার ব্যক্তি বা পদবির পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট দফতর বা প্রতিষ্ঠানের নামে হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনও ব্যক্তি বা ৩-৫ সদস্যের একটি টিম উক্ত ইউজার অ্যাকাউন্টের অ্যাডমিন বা মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। দাফতরিক পেইজের ব্যানার বা প্রোফাইল পিকচারে কোনও ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করা যাবে না।
সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। এই অ্যাকাউন্ট উপরোক্ত নির্দেশনার আওতায় আসবে না। তবে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারি কর্মচারীকেও দায়িত্বশীল নাগরিকসুলভ আচরণ ও অনুশাসন অবশ্যই মেনে চলা নিশ্চিত করতে হবে। কনটেন্ট ও ফ্রেন্ড বাছাইয়ে সতর্কতা অবলম্বন এবং অপ্রয়োজনীয় ট্যাগিং বা রেফারেন্সিং পরিহার করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার বা নিজ অ্যাকাউন্টের ক্ষতিকারক কনটেন্ট-এর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারী ব্যক্তিগতভাবে দায়ি হবেন এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন বা বিধি বিধানের সম্মুখীন হবেন।
কনটেন্ট ব্যবস্থাপনায় বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদেয় ও প্রদত্ত কনটেন্ট অবশ্যই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে। পেইজের অ্যাডমিন বা মডারেটর কনটেন্ট -এর উপযুক্ততা নিশ্চিত হয়ে প্ল্যাটফর্মে প্রকাশের অনুমতি দেবেন। নিজস্ব পোস্টে প্রদত্ত তথ্য ও উপাত্তের যথার্থতা ও নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হবে। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বিষয়াদি সংশ্লিষ্ট কোনও কনটেন্ট প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অপ্রয়োজনীয় বা গুরুত্বহীন বিষয়ে পোস্ট দেওয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে এবং গুরুত্বপূর্ণ কন্টেন্টগুলোর আর্কাইভিং, পুনরায় প্রদর্শন ও শেয়ারিংয়ে উৎসাহিত করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অ্যাডমিন বা মডারেটর প্রতি সপ্তায় কমপক্ষে দু’বার নিজ সাইট হালনাগাদ বা সাড়া প্রদান করবেন। প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অ্যাডমিন বা মডারেটর যুক্তিগ্রাহ্য সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উত্থাপিত সমস্যা, মন্তব্য বা প্রশ্নের বিষয়ে সাড়া প্রদান করবেন। সাড়া প্রদানে বিলম্ব হলে অন্তর্বর্তীকালীন আপডেট দেবেন। প্রয়োজনে এ পোস্টে উত্থাপিত সমস্যা, মন্তব্য বা প্রশ্নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দফতর বা ব্যক্তিকে ট্যাগ করবেন ও তার সাড়া নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হবেন। জনপ্রশাসনে নাগরিক সম্পৃক্তি উৎসাহিত করার লক্ষে সম্ভব সব ক্ষেত্রে, জনসাধারণ বা অংশীজন কর্তৃক পোস্ট প্রদানকে উৎসাহিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নাগরিকের পোস্ট করা বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা ও সাড়া প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
নির্দেশনায় বলা হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার দেশের প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া বাঞ্চনীয়। এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য অন্যান্য আইন ও বিধি-বিধানের পাশাপাশি অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ১৯৭৯, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫, তথ্যঅধিকার আইন ২০০৯, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬, কপিরাইট আইন ২০০০ ইত্যাদি প্রযোজ্য হবে।
নির্দেশনায় যেসব বিষয় পরিহার করতে বলা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- জাতীয় ঐক্য ও চেতনার পরিপন্থী কোনও রকম কন্টেন্ট প্রকাশ করা যাবে না, কোনও সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে এমন বা ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি পরিপন্থী কোনও কন্টেন্ট প্রকাশ করা যাবে না, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা আলোচনা সংশ্লিষ্ট কোনও কন্টেন্ট প্রকাশ করা যাবে না, বাংলাদেশে বসবাসকারী কোনও আদিবাসী, ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা, নৃগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতি বৈষম্যমূলক বা হেয় প্রতিপন্নমূলক কন্টেন্ট প্রকাশ করা যাবে না, কোনও ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে হেয় প্রতিপন্ন করে এমন কন্টেন্ট প্রকাশ করা যাবে না, লিঙ্গবৈষম্য বা এ সংক্রান্ত বিতর্কমূলক কোনও কন্টেন্ট প্রকাশ করা যাবে না ও জনমনে অসন্তোষ বা অপ্রীতিকর মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে এমন কোনও কন্টেন্ট প্রকাশ করা যাবে না।
নির্দেশিকার পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন সংক্রান্ত বিষয়ে বলা হয়েছে, প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নিয়মিতভাবে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে নিজ দফতরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের অগ্রগতি ও কার্যকারিতা পর্যালোচনা করতে হবে, নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সংলাপের মাধ্যমে নিজ নিজ দফতরের উদ্যোগে পর্যালোচনা ও মূল্যায়ন করতে হবে এবং প্রত্যেক পঞ্জিকা বছর শেষে বার্ষিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবহারকারীকে স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে পুরষ্কার বা স্বীকৃতির ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে সেরা পোস্ট, সেরা কমেন্ট, সেরা পেইজ, সেরা নাগরিক সমস্যা উপস্থাপক, সেরা সমাধান, সেরা প্রচার ইত্যাদি বিষয়কে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
নির্দেশিকায় সবশেষে বলা হয়েছে, এ নির্দেশিকা অনুসরণে কোনও সমস্যা বা অসুবিধা দেখা দিলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সমন্বয় ও সংস্কার ইউনিট অথবা এটুআই প্রকল্পের নজরে আনা যেতে পারে।
/ওএফ/এআর/এপিএইচ/