শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কাজ শুরু করেছে রেডলাইন!

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তার দায়িত্বপ্রাপ্ত রেডলাইনদুই বছরের জন্য হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্ব পাচ্ছে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান রেডলাইন অ্যাসুরড সিকিউরিটি লিমিটেড ((Redline Assured Security Ltd))। এই কোম্পানিকে ২ বছরে ৭৩ কোটি ২৫ লাখ ৭৯ হাজার টাকা পরিশোধ করবে বাংলাদেশ। জানা গেছে, কোনও টেন্ডার ছাড়াই প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দিতে রবিবার অর্থনৈতিক ও সরকারের ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। এরই আলোকে সিভিল এভিয়েশন অথোরিটি (সিএএবি) ও রেডলাইনের মধ্যে সোমবার চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে পারে বলে জানা গেছে। চুক্তির শর্তগুলো পর্যালোচনা করছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। যদিও ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান রেডলাইনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছেন।
কবে নাগাদ চুক্তি হচ্ছে—জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রেডলাইনকে আমরা জানিয়ে দিয়েছি। এখন এটি দ্রুত হয়ে যাবে। তাদের ২৯ জন কর্মকর্তা অ্যাডভাইজরি, সুপারভাইজরি ও অপারেশনাল স্তরে কাজ করবেন। এছাড়া, তারা সুপারভাইজরি ও অপারেশনাল স্তরে প্রশিক্ষণ দেবেন। তারা দুই বছরের জন্য কাজটি পাচ্ছেন এবং প্রতি ছয় মাস পরে রিভিউ হবে।

মার্চের ৩১ তারিখ নিয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী বলেন, আমরা এখানকার ব্রিটিশ দূতাবাসকে জানিয়েছি। লন্ডনে আমাদের দূতাবাস বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে সামাল দেবে। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীও বিষয়টি দেখবেন।

বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এখন পর্যন্ত চুক্তির শর্তগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে আরও একদিন সময় নেওয়া হবে চুক্তি স্বাক্ষর করতে।

কবে থেকে কাজ শুরু হবে, জানতে চাইলে রেডলাইনের পরিচালক (বাণিজ্য) জিম টারমিনি ( Jim Termini) বলেন, আমরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছি। সিভিল এভিয়েশনের চাহিদা মতো লোক কাজ করবেন। বর্তমানের ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ ব্যবহার, শাহজালালে নিরাপত্তা বিষয়টি রি-ফোকাস করা হবে।

জিম টারমিনিকার্গো পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার প্রসঙ্গে জিম টারমিনি বলেন, এটা বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার বিষয়। তবে, পরিপূর্ণ পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ বাস্তবায়ন হলে শাহজালাল বিমান বন্দর আন্তর্জাতিক মানের হবে।

শাহজালালে যা করবে রেডলাইন

সিভিলি এভিয়েশন অথোরিটি (সিএএবি) সূত্র জানায়, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুই ধরনের। কোর সিকিউরিটি এবং নন-কোর সিকিউরিটি। কোর সিকিউরিটির আওতায় আছে বিমানবন্দরের ফিজিক্যাল সিকিউরিটি, যাত্রী ও তাদের সম্পদের নিরাপত্তা এবং জেনারেল পুলিশিং। এ কাজটি শাহজালালে করে থাকে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ।
নন-কোর সিকিউরিটির আওতায় স্ক্যানিং করা অর্থাৎ যাত্রীদের ব্যাগ, দেহ তল্লাশি, কার্গোতে আমদানি-রফতানির পণ্য পর্যবেক্ষণ, অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশ রোধ ইত্যাদি। শাহজালালে নন কোর সিকিউরিটির দায়িত্ব পালন করে সিভিল এভিয়েশন সিকিউরিটি।

জানা গেছে, যুক্তরাজ্য ৮ মার্চ থেকে ঢাকা-লন্ডন সরাসরি কার্গো পরিবহন পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাতিল করেছে। গত ৮ মার্চ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরুন এক চিঠিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানিয়েছিলেন, আগামী ৩১ মার্চের মধ্যে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি না হলে বিমানের ঢাকা-লন্ডন সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দেবে যুক্তরাজ্য সরকার।

গত অক্টোবর মাসে মিশরের শারম আল শেখে একটি রাশিয়ান বিমান বোমা বিস্ফোরণের কারণে বিধ্বস্ত হওয়ার পরে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ২০টি দেশের ৩৮ বিমানবন্দরকে তাদের নিরাপত্তা বাড়াতে বলে। এর একটি হচ্ছে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া ঢাকা বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করার জন্য যুক্তরাজ্যকে দায়িত্ব দেয় ।

দিল্লিভিত্তিক ব্রিটিশ এভিয়েশনের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের লিয়াজোঁ অফিসার জন লাভসে গত নভেম্বর মাসে ঢাকা বিমানবন্দর পরিদর্শনে আসেন। তিনি নিরাপত্তা উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু সুপারিশসহ প্রথম রিপোর্ট দেন। ব্রিটিশ অফিসার জন লাভসে তার প্রথম প্রতিবেদনে যাত্রী পরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে জানান। প্রতিবেদনে তিনি জানান, যাত্রীদের সঠিকভাবে স্ক্যানিং করা হয় না। এছাড়া, মালামাল ট্যাগ করার যন্ত্রপাতিও ব্যবহার করা হয় না। ব্রিটিশরা তাদের অভিযোগে বলেছেন, বিমানবন্দরে যারা স্ক্যান করেন, তারা স্ক্যান করার সময়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকেন, বসে বসে টেলিফোনে কথা বলেন, অন্য লোকের সঙ্গে গল্প করেন, তাদের ট্রেনিং নেই। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী ২০ মিনিট স্ক্যান করার পরে ৪০ মিনিট বিশ্রাম দিতে হবে, কিন্তু বাংলাদেশে লোকবল কম থাকায় এক বা দুই ঘণ্টা একটানা কাজ করতে হয়। এরপর আবার ডিসেম্বরের মাঝামাঝি জন লাভসে ঢাকা আসেন এবং দ্বিতীয় প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদনে কার্গো পরিবহন বিষয়ক বেশ কিছু সুপারিশ ছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কার্গো রাখার জায়গায় বেসরকারি ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের লোকরা কাজ করেন। নিরাপত্তা ট্যাগ লাগানোর মেশিন ব্যবহার করা হয় না।

কার্গো ওয়ারহাউজের বাইরে মালামাল স্তূপ করে রাখা হয়। রিপোর্টে কার্গো রাখার জায়গায় ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার প্রতিষ্ঠানের সব বেসরকারি লোককে সরিয়ে নিতে বলা হয়, নিরাপত্তা ট্যাগ লাগানোর জন্য মেশিন ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কার্গো ওয়ারহাউজের বাইরের মালামাল ভেতরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিমানবন্দরে এক্সপ্লোসিভ ট্রেসিং মেশিনও কাজ করে না বলেও রিপোর্টে বলা হয়। এছাড়া, এ সংক্রান্ত কাজে নিয়োজিত লোকদের সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ নেই বলেও তারা জানান।

এদিকে, মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ব্রিটিশ এভিয়েশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে কাজ করবে রেড লাইন। বিমানবন্দরে সিভিল এভিয়েশনের যারা স্ক্যান করেন, তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এছাড়া, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা বাহিনীকে সুপারভাইজ করবে রেড লাইন। বিমান বন্দরের নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ দেবে। রেডলাইনের কর্মীরাও স্ক্যানিংয়ের কাজ করবেন।

এ প্রসঙ্গে রেডলাইনের পরিচালক (বাণিজ্য) জিম টারমিনি (Jim Termini) বলেন, আমাদের দক্ষ সুপারভাইজার, প্রশিক্ষক, পরামর্শক শাহজালাল বিমানবন্দরে কাজ করবেন। বর্তমান ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ ব্যবহারসহ নিরাপত্তা বিষয়টিকে রি-ফোকাস করা হবে।

রেডলাইনের ওয়েব সাইট থেকে জানা গেছে, ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এটি। এভিয়শন নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের জন্য ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশনের অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া, প্রতিষ্ঠানটি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে অডিট ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ সুবিধা দেয়। ৮০ জন দক্ষ কর্মী ও ২০০ সহযোগীর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। সারাবিশ্বে ২০০ প্রতিষ্ঠান রেডলাইনের সেবা নিচ্ছে বলেও ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে।

/এমএনএইচ/