অপরাধ দমন করা ছাড়াও পুলিশকে জনবান্ধব করতেই ‘বিট পুলিশ’ গঠন করা হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছর আগে। অথচ, কিছুদিন পরই চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ ওঠে এই বিট পুলিশের বিরুদ্ধে। এক পর্যায়ে বিট পুলিশিং কার্যক্রম অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়ে। সম্প্রতি আবারও বিট পুলিশকে সক্রিয় করার চেষ্টা করছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের শনাক্ত করা ছাড়াও সার্বিক অপরাধ দমনে কার্যকর ফল পাওয়া যাবে বলে মনে করেন পুলিশ কর্মকর্তারা। এ জন্য রাজধানীর থানায় থানায় উঠোন বৈঠক করছেন তারা।
এলাকার মানুষের সুখ-দুঃখের অংশীদার হতেই ২০১০ সালে বিট পুলিশিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যবস্থা চালুর পর চাঁদাবাজি ও স্থানীয় সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সখ্যসহ নানা অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। এতে একজন সাব-ইনসপেক্টরের নেতৃত্বে তিন থেকে পাঁচজন কনস্টেবল বিট পুলিশিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের কাজই হচ্ছে, অপরাধ দমন ও এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে থানা বা ফাঁড়িকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করা। সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী হওয়া।
সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, শহর এলাকায় পুলিশিং ব্যবস্থাকে ছোট-ছোট অংশে ঢেলে সাজানোকেই বিট পুলিশিং বলা হয়। আর গ্রাম এলাকায় এটাকে বলা হয় জেএল (জুরিডিকশন লিস্ট)। এটি সাধারণ মানুষের কাছে নতুন শোনালেও পুলিশের কাছে বিষয়টি নতুন নয়। পুলিশিং ব্যবস্থার শুরু থেকেই এ পদ্ধতি চলে আসছে। পদ্ধতিটি ধার করা হয়েছে ব্রিটিশ পুলিশের কাছ থেকে। থানায় কোনও মামলা দায়ের হলে ঘটনাস্থল নির্দেশ করতে সেই এজাহারে শহর এলাকায় বিট নম্বর ও গ্রাম এলাকায় জেএল নম্বর লেখা হয়ে থাকে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী এ ব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ ও নতুন করে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়ার কারণেই বর্তমানে এ পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা চলছে।
নতুনভাবে বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে চালুর বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, বর্তমানে রাজধানীর প্রতিটি থানা এলাকায় তিন থেকে নয়টি করে ২৮৭টি বিট কার্যকর রয়েছে। এসব বিটের ইনচার্জ হিসেবে একজন সাব ইনসপেক্টর প্রয়োজনীয় পুলিশ সদস্য নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। জনগণের জন্য পুলিশের সেবাকে অধিকতর গতিশীল ও কার্যকর এবং পুলিশের কার্যক্রমের সঙ্গে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়াতে ডিএমপি’র বিভিন্ন থানা এলাকায় কমিউনিটিং পুলিশিং ব্যবস্থার পাশাপাশি বিট পুলিশিং কার্যক্রম নতুনভাবে শুরু করা হয়েছে। এর ফলে প্রতিটি এলাকার অপরাধ প্রকৃতি ও অপরাধী সম্পর্কে ধারণা বাড়বে।
এলাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বসবাসকারীদের কৌশলগত অবস্থান এবং এলাকাবাসী সম্পর্কে তথ্যভাণ্ডার সমৃদ্ধ হবে। এতে কোনও অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধীকে শনাক্ত করা সহজ হবে। অপরাধ দমন ও উদঘাটনে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে যেতে পারবে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, মামলা তদন্ত, আসামি গ্রেফতার, ওয়ারেন্ট তামিল, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ, অস্ত্র উদ্ধারসহ সার্বিক অপরাধ প্রতিরোধে গতিশীলতা আসবে। গণসচেতনতা বাড়বে এবং সামাজিক অপরাধগুলো কমে আসবে। থানার জনসংখ্যা, অপরাধের মাত্রা, ধরন ও টহলের জন্য সুবিধাজনক পরিধির ওপর ভিত্তি করে বিট সৃষ্টি করা হয়েছে।
বিট পুলিশিং কার্যক্রমকে গতিশীল করতে রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় উঠান বৈঠক করছে ডিএমপি। কয়েকটি উঠোন বৈঠকে অংশ নিয়ে ডিএমপির যুগ্ম-কমিশনার (অপরাধ) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, জনগণের সঙ্গে থানা পুলিশের সহজ যোগাযোগ ও মানুষের আইনের সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনবান্ধব পুলিশ গড়ে তোলাই বিট পুলিশিংয়ের আসল উদ্দেশ্য।
ডিএমপির জনসংযোগ শাখার উপ-কমিশনার মারুফ হোসেন সরকার জানান, জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অবস্থান চিহ্নিত করতে বর্তমানে বিট পুলিশ ডিএমপি এলাকায় বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়া সম্পর্কে নির্দিষ্ট ফরমে পরিচিতিমূলক তথ্য সংগ্রহ করছে। এনজিও, কলেজ, কমিউনিটি সেন্টার, কোচিং সেন্টার, কেপিআই, ক্লিনিক, খেলার মাঠ, ছাত্রাবাসের তালিকা, মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, গীর্জা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মেসের তালিকা, রাজনৈতিক অফিস, রেল স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনালের নাম, বিশ্ববিদ্যালয়, সিনেমা হল ও বিনোদন কেন্দ্র, স্কুল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, হাসপাতাল, বস্তির তালিকা, বাসস্ট্যান্ড, গার্মেন্টসের নাম, ব্যাংক-বীমা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, মার্কেট, সরকারি ও বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সির নাম, হোটেল, শিল্প কারখানার নাম ও ঠিকানাসহ তথ্য সংগ্রহ করছে বিট পুলিশ। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা বাড়বে বলে মনে করছে পুলিশ।
/এমএনএইচ/
আপ-এসটি