মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টা। একটি নীল রঙের পিকআপ ভ্যান সাইলেন্সার বাজিয়ে দ্রুত ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটর হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের দিকে যাচ্ছে। খোলা পিকআপে পড়ে আছে একটি নিথর দেহ। তার পরনে সাদা চেক লুঙ্গি,গায়ে ছাই রঙের ফুল শার্ট।তবে শার্টের বোতাম খোলা। রক্তাক্ত মুখভর্তি লম্বা দাড়ি। পিকআপের সামনে চালকের সঙ্গেই বসা এক পুলিশ সদস্য।ওই দিন বিকেলে ঢামেক হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেল খোলা পিকভ্যানে থাকা নিথর দেহটি অজ্ঞাত এক ব্যক্তির লাশ। মঙ্গলবার সকালে তিনি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে গাড়ির ধাক্কায় নিহত হয়েছিলেন।লাশটি সাভার পুলিশের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমিনুল ইসলাম উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসেন। পরিচয় নিশ্চিত না হওয়ায় এভাবেই কনস্টেবল মো. সবুজকে দিয়ে লাশটি ঢামেক হাসপাতালের মর্গে পাঠায় সাভার থানা পুলিশ।
লাশ পরিবহনে পুলিশের বাধ্যতামূলক কিছু নিয়ম কানুন রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। সাভার থেকে লাশটি খোলা পিকআপে করে উন্মুক্ত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়। পথে পথে রক্তাক্ত লাশের বীভৎসতা দেখেছে শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষ। অথচ নির্দিষ্ট ‘বডিব্যাগ’ ছাড়া কোন লাশ পরিবহনের কথা নয় পুলিশের।
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে লাশটি পড়েছিল। খবর পেয়ে আমাদের থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমিনুল ইসলাম লাশটি উদ্ধার করেন। আমি ওই সময় ডিউটিতে ছিলাম, তাই আমাকে দিয়েই লাশটি মর্গে পাঠানো হয়েছে।’
তবে অমর্যাদাকরভাবে পুলিশের লাশবহনের বিষয়টি নতুন নয়।বিভিন্ন সময় তারা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে টিটিপাড়া রেললাইন এলাকায় নারায়ণগঞ্জগামী একটি ট্রেনের ধাক্কায় লাইনে পড়ে আনুমানিক ৬০ বছর বয়সী এক ব্যক্তি নিহত হন। তার পরনে ছিল চেক লুঙ্গি ও সবুজ শার্ট। লাশটিকে রিকশায় যাত্রীর আসনে সাদা কাপড়ে ঢেকে বস্তায় ভরে বাঁশ দিয়ে বেধে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে নিয়ে আসেন রেলওয়ে পুলিশের অস্থায়ী ডোম বিহারি। ঢাকা রেলওয়ে পুলিশের এমন কাজ নিয়ে সর্বত্র সমালোচনা হয়।
এর আগে ওই মাসেরই ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কারওয়ান বাজার মাছের আড়ৎসংলগ্ন রেললাইনে দুই ট্রেনের মাঝে পড়ে পাঁচজন নিহত হন।এরপর বস্তায় ভরে বাঁশ বেধে নিহত একজনের লাশ ঢামেক হাসপাতালের মর্গে আনা হয়।
লাশের প্রতি মর্যাদাশীল হওয়ার জন্য প্রতিটি ধর্মে বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে মাদরাসা শিক্ষক মুফতি ফয়জুল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘একজন জীবিত মানুষের প্রতি আমরা যেভাবে শ্রদ্ধাশীল হই,ঠিক সেইভাবেই একজন মৃতব্যক্তিকেও সম্মান দেখাতে হবে। কোনও লাশ টেনে হেচড়ে,ভ্যানে বেধে,কাপড়-চোপড় ছাড়া বহন করা ইসলামের নীতি পরিপন্থি। লাশের দাফন পর্যন্ত এই সম্মান বজায় রাখতে হবে।’
এবিষয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,‘লাশ পরিবহনে পুলিশ বাহিনীর নিজস্ব নিয়ম রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। তাদের সেই নিয়ম মেনেই লাশ পরিবহন করা উচিৎ। কারণ একটি বিভৎস্য লাশ সাধারণ মানুষের ভেতরে বিভিন্ন ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তাই অবশ্যই সম্মানের সঙ্গে লাশ পরিবহন করা উচিৎ।’
এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের জনসংযোগ ও গণমাধ্যম শাখার এআইজি নজরুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুলিশকে যতটা সক্ষমতা দেওয়া হবে, সেই সক্ষমতা অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যেখানে যেখানে বডিব্যাগ রয়েছে, সেখানে ব্যবহৃত হয়। যেখানে নেই সেখানে বিকল্প কিছু করার নেই।’
/এআরআর/এমএসএম