ইবতেদায়ি শিক্ষক, নন-এমপিওভুক্ত আইসিটি শিক্ষক, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক, নন-এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল শিক্ষক, এমপিওভুক্ত স্কুল শিক্ষক, বিসিএস শিক্ষক,বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আন্দোলনের মাঠে আছেন দীর্ঘদিন ধরে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের আন্দোলন
অষ্টম জাতীয় বেতন কাঠামোতে সপ্তম জাতীয় বেতন কাঠামোর তুলনায় গ্রেড-১ প্রাপ্ত শিক্ষকদের সংখ্যা অর্ধেক কিংবা তারও নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। গ্রেড-১ প্রাপ্ত শিক্ষকদের সুপার গ্রেডের ২য় ধাপে যাওয়ার কোনও সুযোগ ও নির্দেশনা তাতে নেই। এ অসঙ্গতি দূর করার জন্য সরকারকে বারবার হুঁশিয়ারি দিলেও কোনও লাভ হয়নি। পরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ করে দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামার পর সরকারের প্রথম টনক নড়ে।
গত ১৮ জানুয়ারি এক পিঠা উৎসবের দাওয়াতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আশ্বাস পাওয়ার পরই আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ান শিক্ষকরা। এরপর প্রায় দুই মাস কেটে গেলেও সে বিষয়ে কোনও অগ্রগতি নেই। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মনে ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসের পরও এখন পর্যন্ত আমাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়নি। কয়েক ধাপে কেবিনেট মিটিংয়ে বসার পরও অবস্থার উন্নতি হবে এই আশায় আমরা একের পর এক সময় দিয়ে যাচ্ছি সরকারকে। তবে বেশি বিলম্ব আমরাও আর মেনে নেব না। এবার আরও শক্ত কোনও আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো। তবে দাবি মেনে নেওয়া হবে সে বিশ্বাস এখনও আমাদের আছে।
সরকারি কলেজের শিক্ষকদের আন্দোলন
বিসিএস ক্যাডার শিক্ষকদের অভিযোগ, অষ্টম বেতন কাঠামোতে অধ্যাপকদের পদমর্যাদা ও বেতনক্রমের অবনমন করা হয়েছে। সিলেকশন গ্রেড বাতিলের ফলে অধ্যাপকদের চতুর্থ গ্রেড থেকেই অবসরে যেতে হবে। ফলে মর্যাদা ছাড়াও বিশাল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা। সরকারের এ ব্যবস্থা ‘সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করার সামিল’ বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক শিক্ষক।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথমেই আন্দোলনে নেমেছিলেন সরকারি কলেজের শিক্ষকরা। পরে ২৭ জানুয়ারি সরকারের আশ্বাসের পর আন্দোলন স্থগিত করা হয়। দুই মাস কেটে গেলেও সরকারের পক্ষ থেকে আর কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। ফলে আবারও আন্দোলনে নামার চিন্তাভাবনা করছেন কলেজের শিক্ষকরা।
বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষকদের এমপিওর দাবি
এমপিওভুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি পেশ করেছেন বাংলাদেশ বেসরকারি কলেজ অনার্স-মাস্টার্স শিক্ষক পরিষদ। একইসঙ্গে তারা গত রবিবার থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
অভিযোগ করে সংগঠনের সভাপতি কাজী ফারুক বলেন, ‘এমপিওভুক্ত বেসরকারি কলেজে অন্যান্য শিক্ষকদের মতো নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েও, কোনও জনবল কাঠামো না থাকায় দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে আমরা এমপিওভুক্ত হতে পারছি না।’
শিক্ষকদের দাবি ‘প্রচলিত জনবল কাঠামো সংশোধন করে নবম ও দশম জাতীয় সংসদে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি মোতাবেক নিয়োগকৃত শিক্ষকদের এমপিওভূক্ত করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী এই শিক্ষকদের দীর্ঘ ২৩ বছরের বঞ্চনার দাবি আগামি বাজেটের আগেই বাস্তবায়ন করতে হবে।
স্কুলের কম্পিউটার শিক্ষকদের দাবি
স্কুলে স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার শেখানো হচ্ছে। অথচ এই কম্পিউটার শিক্ষকরা এখনও এমপিওভুক্ত হননি। তাই এমপিওভুক্তির দাবিতে গত ১২ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ক্লাস বর্জন করে তারা অবস্থান ধর্মঘটে অংশ নেন। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রফেসর ফাহিমা খাতুনের আশ্বাসের পর এ আন্দোলন থেকে সরে আসেন তারা। তবে এই শিক্ষকরা মার্চ মাসের এমপিও পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করবেন। যদি এ মাসের মধ্যে দাবি আদায় না হয়, তাহলে এপ্রিল থেকে আবারও আন্দোলনে যাবেন বলে জানিয়েছেন আইসিটি শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি আশিকুজ্জামান।
তাদের দাবি, সরকার ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর এক পরিপত্রের মাধ্যমে আইসিটি শিক্ষকদের এমপিও স্থগিত করে। এরপর এ বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। যখন থেকে তারা চাকরিতে যোগ দিয়েছেন, ঠিক ওই মাস থেকেই এমপিও দিতে হবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের দাবি
নতুন বেতন কাঠামোতে ৪০ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে দাবি বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতাদের। অবিলম্বে শিক্ষকদের গেজেটেড মর্যাদাসহ বেতন নির্ধারণের মাধ্যমে এ জটিলতা দূর করার দাবিতে একের পর এক হুমকি দিয়ে গত জানুয়ারিতে আন্দোলনে নামেন শিক্ষকরা। এখানেও সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস আসে। আপাতত তাদের আন্দোলনও স্থগিত রয়েছে।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ২০১৪ সালে প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা এবং সহকারী শিক্ষকদের একধাপ বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধান শিক্ষকদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেওয়ার কারণে ২০১৪ সালের ৯ মার্চ থেকে তাদের টাইম স্কেল বন্ধ হয়ে যায়। ফলে যেসব প্রধান শিক্ষক সপ্তম জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী আট হাজার টাকা স্কেলে বেতন পেতেন, তাদের বেতন ১৬ হাজার টাকার স্কেল (দশম ধাপে) হওয়ার কথা। কিন্তু তাদের বেতন ১২ হাজার ৫০০ টাকা স্কেলে (এগারোতম ধাপে) নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে নতুন ৪০ হাজার প্রধান শিক্ষক প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ হাজার টাকা করে কম পাবেন।
ইবতেদায়ি শিক্ষকদের আন্দোলন
প্রায় ৩০ বছর ধরে জাতীয় স্কেলে বেতনের অধিকার থেকে বঞ্চিত ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষকরা কয়েক দফায় আন্দোলনে নেমেছেন। প্রায় ৫ বছর ধরে তারা বিষয়টি সরকারের নজরে আনার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনও সাড়া না পেয়ে সর্বশেষ তারা অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন ফেব্রুয়ারি থেকে। প্রায় একমাস আন্দোলন করার পর বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সদস্য সচিব অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান আলম সাজু তাদের আশ্বাস দিয়ে আন্দোলন প্রত্যাহার করার অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে ইবতেদায়ি শিক্ষক সংগঠনের মহাসচিব কাজী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, সরকারের আশ্বাসের পর ৯ এপ্রিল পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। সময় পেরিয়ে গেলে আবারও আন্দোলনে যাব।
জানা যায়, তারা গত ৩০ বছর ধরে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে আসছেন, কিন্তু তাদের জন্য কোনও বেতন কাঠামো নেই, শুধু নামে মাত্র প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়।
প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকদের মহাসমাবেশ
সহকারী শিক্ষকদের বেতন ১১তম গ্রেডে পুনর্নির্ধারণ, প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ বন্ধ করে সহকারী শিক্ষক পদ থেকে নিয়োগ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভাগীয় পরীক্ষার মাধ্যমে মহাপরিচালক পদ পর্যন্ত শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি, নিয়োগ বিধিমালা পরিবর্তন করে নারী-পুরুষের জন্য ন্যূনতম স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি যোগ্যতা নির্ধারণ, শিক্ষকদের জন্য স্বতন্ত্র বেতন স্কেল ঘোষণা ও সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু, টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেড পুনর্বহাল করে দ্রুত পদন্নোতির ব্যবস্থা করা এবং অর্জিত ছুটির বিধান প্রণয়ন করার দাবি করেন প্রাথমিক সহকারী শিক্ষকরা। ছয়দফা দাবি আদায়ে গত ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক মহাসমাবেশের ডাক দেন তারা।
সংগঠনটির সভাপতি শাহিনুর আল আমীন জানান, তারা দীর্ঘদিন ধরে বেতনসহ নানা ধরনের পেশাগত বৈষম্যের শিকার। দাবি আদায়ে মাঠে নামবে তারা।
এমপিওভুক্ত স্কুলে নন-এমপিও শিক্ষকদের আমরণ অনশন
এমপিওভুক্ত স্কুলে নন-এমপিও শিক্ষকরা গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরণ অনশন করছিল। তাদের দাবি তারা আর বিনা বেতনে এ পেশায় থাকতে চান না। তারা এমপিও চান। সংগঠনের সভাপতি প্রদীপ চন্দ্র রায় জানিয়েছেন, ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনটি বাতিল করে সৃষ্ট পদে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির নির্দেশনা দিতে হবে। পাশাপাশি এসব পদে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষককে চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে সরকারি বেতন-ভাতা দিতে হবে।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনরত শিক্ষকদের অনশন ভাঙান প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। এ সময় তিনি অনশনরত শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও আশ্বাস দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনও আলোচনা হয়নি।
অনিশ্চিত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পে-স্কেল
নতুন বেতন কাঠামো অনুযায়ী সরকারি অন্যান্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে গত ১ জুলাই থেকে দেশের প্রায় পাঁচ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক কর্মচারীকে সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত ২০ ডিসেম্বর এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি কর হয়েছে। এখন পর্যন্ত সেই এমপিও কার্যকর হয়নি। ফলে এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে তারা দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবি, যত দ্রুত সম্ভব এমপিও কার্যকর করা হোক।
শিক্ষকদের দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সম্প্রতি গণমাধ্যমে বলেছেন, আমাদের সম্পদ বাড়েনি, কিন্তু নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী শিক্ষকদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উচ্চস্তরে ওঠার পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বিসিএস ক্যাডারের শিক্ষকদের মনে কষ্ট রয়েছে। আমি শিক্ষকদের পক্ষে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের স্বার্থের পক্ষে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও বিসিএস শিক্ষকদের টাইমস্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিকল্প ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তারা (শিক্ষকরা) যেন সর্বোচ্চ পদে যেতে পারেন সে পথ খোঁজা হচ্ছে।
শিক্ষকদের বেতন নিয়ে কার্পণ্য করা, মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনও কাজ করা একদমই উচিত নয় বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শিক্ষকদের বেতন, মর্যাদা নিয়ে টালবাহানা করলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উজ্জ্বল হতে দেখব না, আশঙ্কা এটাই। কারণ শিক্ষকদের বেতন কম দিয়ে মর্যাদাহানী করা হলে তারা ঠিকমত পাঠদান করবেন না, এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন দরকার। ইতোমধ্যে সরকার অনেক এগিয়েছে, তবুও অনেক অসঙ্গতি রয়ে গেছে, যা দ্রুত সমাধান করা জরুরি।
/আরএআর/এজে/