১৯৭১ এর গণহত্যা: পাকিস্তানের অস্বীকারের ৪৫ বছর

১৯৭১ এর গণহত্যার দলিল

স্বাধীনতার ৪৫ বছরে এসেও ১৯৭১ -এর গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত পাকিস্তান দায় স্বীকার বা ক্ষমা প্রার্থনা করেনি। নানা সময়ে গণহত্যাকে অস্বীকার করলেও তারা ভুলেই গেছে বাংলাদেশ জন্ম হওয়ার অব্যবহিত পরে তাদের সেনারাই নানা জবানবন্দি বিভিন্ন জায়গায় লিপিবদ্ধ করে গেছেন। দালিলিক ও মৌখিক প্রমাণ থেকে এটা স্পষ্ট পাকিস্তানের বর্তমানের কোনও অস্বীকারই ধোপে টিকবে না। একই সঙ্গে ঝুলে আছে উত্তরসূরি রাষ্ট্র হিসেবে অবিভাজিত সম্পদে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যা আদায়, আটকে পড়া পাকিস্তানিদের স্বদেশে প্রত্যাবাসন এবং বাংলাদেশকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদানের মতো জরুরি ইস্যু। বিচারপ্রার্থীরা বলছেন, পাকিস্তানের এই ধৃষ্টতা আজকের না। অবিলম্বে তাদেরকে দায় স্বীকার করাতে কূটনৈতিক তৎপরতা জরুরি বলেও মনে করছেন তারা।

গণহত্যা

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ১৯৭৪ সালের এপ্রিল মাসে ত্রিপক্ষীয় এক আলোচনায় পাকিস্তান এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, ’৭১ এর বর্বরতার জন্য বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইবে তারা। বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান-এই তিনদেশের ওই আলোচনায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, সুনির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনাসদস্যকে ফিরিয়ে দিলে পাকিস্তান সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতিও দেবে। আলোচনার এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে যুদ্ধাপরাধী ওই ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার বিচার না করে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয় তাদের। পাকিস্তান তাদের বিচারের মুখোমুখি করেনি বরং ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলী খান পক্ষ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড

২০১২ সালে উন্নয়নশীল আট দেশের জোটের শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানাতে ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি। তার কয়েক ঘণ্টার সফরেই ক্ষমা চাওয়ার দাবিটি সামনে এনেছিল বাংলাদেশ। জবাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগোনোর আহ্বান জানান। ২০০২ সালেও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল (অব) পারভেজ মোশাররফ বাংলাদেশ পরিদর্শনে এসে স্মৃতিসৌধে যান এবং তার বক্তব্যেও একই স্বর ছিল:  ‘বড় মনের পরিচয় দিয়ে আসুন আমরা অতীতকে মাটিচাপা দিই। আসুন, একত্রে সামনের দিকে এগোই।’ কিন্তু কোথাও ক্ষমা চাওয়ার কথা নেই।

গণহত্যার প্রমাণ

হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের দায় পাকিস্তান যতই অস্বীকার করুক বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এখনও ছড়িয়ে আছে এর প্রমাণ। ড. এম হাসানের গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে ক্যাপ্টেন নিয়াজি ও তার সহযোগীদের নেতৃত্বে পাকিস্তান আর্মি পঞ্চগড় জেলায় ব্যাপক গণহত্যা, জাতিগত নিধন, ধর্ষণযজ্ঞ ও অগ্নিসংযোগ করেন। পঞ্চগড় শহরে পঞ্চাশ ষাটজন নিরীহ বাঙালিকে তারা হত্যা করে। ধর্ষণ করে শহরে অবস্থানরত কিশোরী ও যুবতী নারীদের প্রায় সকলকে। এই জেলার আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে পুরানদীঘি নামে একটি বধ্যভূমি রয়েছে।ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি এদেশে প্রায় ৯৪২টি বধ্যভূমি শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১১৬টি স্থানকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বধ্যভূমি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

`৭১ এ গণহত্যার প্রমাণ

প্রত্যক্ষদর্শীর জবানে বেরিয়ে আসে,পঞ্চগড়ের গণহত্যার সঙ্গে যেসব পাকিস্তান আর্মি জড়িত ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ক্যাপ্টেন নিয়াজী। এখানে পাকিস্তান বাহিনীর সহযোগী ছিলেন খমির উদ্দীন চেয়ারম্যান ও মুসলিম লীগের সদস্যরা। জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের সদস্যরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হিসেবে এখানে অবস্থান করায় তাদের স্ত্রী, কন্যা ও বোনদের ওপরেই পাকিস্তানী সৈন্যরা নির্যাতন চালায়। তারা পিস কমিটির চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের বাড়ির মেয়েদের ধরে এনে ক্যাম্পে রেখে নির্যাতন করে। প্রায়  শ’ খানেক মহিলা এখানে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নির্যাতিত হয়েছেন।

`৭১ এ গণহত্যা

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপিত শাহরিয়ার কবীর বলেন, গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া এ দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। স্বাধীনতা আন্দোলনে এত নৃশংসতা, হতাহতের ঘটনাও ইতিহাসে বিরল।পাকিস্তান যত দিন ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য ক্ষমা না চাইবে, ততো দিন এ ইস্যু দুই দেশের সম্পর্কে বড় বাধা হয়ে থাকবে। তিনি আরও বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে জামায়াত ও বিএনপির নেতাদের ফাঁসি কার্যকরকে ঘিরে তারা যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে সেটা তাদের ধৃষ্টতা।বাংলাদেশ সরকার এ ঘটনায় পাকিস্তানের অবস্থানের কড়া প্রতিবাদ জানানোয় পাল্টা তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানিয়েছে। এসব দিকগুলো সুরাহা করতে শক্তিশালী কূটনৈতিক তৎপরতা আমাদের পক্ষ থেকে জরুরি। দেশটি যে গণহত্যা চালিয়েছিল, তার বহু দালিলিক প্রমাণ রয়েছে।

/এপিএইচ/