গত ৭ মার্চ রাজধানীর কাফরুলে খুন হন গৃহকর্মী জনিয়া বেগম(১৫)। ঘটনার তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই তদন্তে। এজন্য যুগ্ম সচিব আহসান হাবিব, তার স্ত্রী নাজনিন আকতার ও ছেলে রুম্মান বিন আহসানকে (২৬) অভিযুক্ত করে নিহতের বাবা হত্যা মামলা করতে গেলে পুলিশ একটি অপমৃত্যু মামলা করে। এমনকি অভিযুক্তদের আটক বা জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি।
এদিকে এ মাসের ১২ তারিখ গণধর্ষণের শিকার হন সরকারি অ্যাডওয়ার্ড কলেজের এক ছাত্রী। ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও পাবনার বেশ কয়েকটি কলেজে এ নিয়ে প্রতিবাদ সমাবেশ হলেও কয়েক দিনেই তা থিতু হয়ে যায়। মামলার তদন্ত বিষয়েও কোনও অগ্রগতি নেই। এর আগে রাজধানীতে এক রাতে দুই তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে গত বছরের জুলাইয়ে। এছাড়া রাজধানীর ব্যস্ততম রাস্তা থেকে গারো তরুণীকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণের ঘটনাও ঘটে। গেলো জানুয়ারিতে রাজবাড়ীর পাংশায় সরিষা ইউনিয়নের আদিবাসী এক নারী ও তার মেয়ে ধর্ষণের শিকার হন।
সর্বশেষ গত ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় পাওয়া যায় সোহাগী জাহান তনুর লাশ। পুলিশের ধারণা, ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনুকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে এমন অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ দানা বাঁধছে রাজধানীসহ অন্যান্য শহরে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষণ ও হত্যাকারীকে গ্রেফতার না করলে প্রধানমন্ত্রী অফিস ঘেরাওয়ের কর্মসূচি দিয়েছে ছাত্র ইউনিয়ন।
দেশে ধর্ষণের হার ক্রমাগত বাড়ছে। পুলিশের বিভিন্ন হস্তক্ষেপে এবং সমাজে নারীর ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতায় সুরক্ষা আইন থাকলেও তা কাজে আসছে না। ধর্ষণের পর হত্যাকে অপমৃত্যু মামলা দিয়ে পরবর্তীতে ধর্ষক পরিবারের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টারও অভিযোগ আছে।
এ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে মনে করেন অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা। তারা বলছেন, মূলত সমাজ এক ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়ার ফলে এরকম অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফলে অপরাধের মাত্রা বাড়ছে। বিচারবহির্ভূত আইন ব্যবস্থা, পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন না হওয়া, নারীর ‘ইজ্জত রক্ষার’ দায়িত্ব নারীর- এসব ভাবনা প্রতিষ্ঠিত থাকায় ধর্ষণের মতো অপরাধের প্রবণতা বাড়ছেই।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রকাশিত তথ্য অনুসারে ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪১৬ জন নারী ও কন্যাশিশু। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৮৪ জন। তাদেরকে চিকিৎসা সেবা প্রদানকারী ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার কর্তৃপক্ষ বলছেন, প্রতিদিন গড়ে ৪-৫ জন ধর্ষণের শিকার নারী-শিশু চিকিৎসার জন্য আসছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান মনে করেন, কোনও অপরাধ ঘটতে থাকলে সেটার একটা প্রভাব সমাজে পড়ে। একসময় মানুষ যখন অনুধাবন করতে শুরু করে যে- বিচার পাচ্ছে না, তখন সে রাষ্ট্রকে এসব অপরাধ ও নির্যাতনের পৃষ্ঠপোষক মনে করতে শুরু করে এবং আন্দোলনে নামে। ফলে এখন যে আন্দোলন ঘটছে এটা দীর্ঘদিন বিচার না পাওয়ার হতাশার ফল বলেই সবাই একসঙ্গে জেগে উঠতে চাইছে।
তিনি বলেন, মানুষের মধ্যে এই আস্থা ফিরাতে হবে যে- ন্যয়বিচার হয়। এখন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এগুতে হবে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আর দীর্ঘ মেয়াদে ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম ঢেলে সাজাতে হবে।
মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী এলিনা খান বলেন, ঢাকার মতো শহরে যেখানে কাজ থেকে বাসায় ফেরা নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এবং সেটার কোনও বিচার হচ্ছে না, সেখানে মফস্বলে কী ঘটছে তা আমরা আন্দাজও করতে পারি না। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে পরিমাণ নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে সে পরিমাণ অভিযোগ হয় না। কারণ আমাদের কাছে অভিযোগ আছে- পুলিশ বিভিন্নভাবে সমঝোতার উদ্যোগ নিতে চায়। আবার যে মেয়েটি ভিকটিম তার চরিত্র হননেরও বিভিন্ন ঘটনা আমাদের সমাজে ঘটে।
/এএইচ/