শেষ সময়েও পরস্পরের ওপর থেকে সন্দেহ যাচ্ছে না দলগুলোর

প্রচারণা শেষ, নির্বাচনের সামগ্রী পৌঁছে গেছে সারা দেশে। প্রার্থীরা অনেক দিন পর একটু সুস্থির হয়ে বসে শেষ সময়ের পরিকল্পনা করছেন। কিন্তু শেষ হলেও যেন সন্দেহ কাটছে না পরস্পরের মধ্যে। নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আমাদের দীর্ঘদিনের নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ থাকার কারণে এটা হচ্ছে এবং নির্বাচনের সময় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে এ ধরনের সন্দেহ থাকবে। নির্বাচন কমিশন কতটা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজটি সম্পন্ন করতে পারবে, তার ওপর নির্ভর করবে এই সন্দেহ দূর হওয়া বা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হওয়া।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রচারণা শেষ হয়েছে। রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘প্রশাসনের একটি অংশের পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং নির্বাচনি পরিবেশে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাব আছে।’’ তিনি বলেন, “কোনও ধরনের পাতানো নির্বাচন করার চেষ্টা করা হলে তা জামায়াত মেনে নেবে না।”

এদিকে, মঙ্গলবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান নির্বাচন কমিশন থেকে বেরিয়ে এসে প্রথম দাবি করেন, ব্যালট বাক্স এজেন্টদের সামনে প্রকাশ্যে রাখতে হবে, যাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, ‘‘আশা করি, নির্বাচনের দিন পরিস্থিতির অবনতি হবে না। কিন্তু নারীদের জন্য বিশেষ কাপড় তৈরি, ব্যালট পেপার ও ব্যালটের সিলসহ বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনা ধরা পড়ছে। এসব বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। কিছু মানুষ নিজেদের অতিরিক্ত ক্ষমতাবান মনে করে আইন অমান্য করার চেষ্টা করেন, এ প্রবণতা রোধ করতে হবে।’’

চারদিকে যখন সন্দেহের নানা কিছু মনে ঘুরছে, সেসময় মঙ্গলবারই পুলিশের পরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘‘সারা দেশে ৮ হাজার৭৭০টি ভোটকেন্দ্র অতি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রে বডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া ড্রোন ব্যবহার করা হবে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেকোনও অস্ত্র হুমকি জানিয়ে আইজিপি বলেন, ‘‘এর বাইরেও বিভিন্নভাবে অস্ত্র দেশে প্রবেশ করে। সেসব মোকাবিলা করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ‘

কেন এত সন্দেহ আর অবিশ্বাস সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ‘‘বিগত বছরগুলোতে নির্বাচন নিয়ে এত কারচুপি হয়েছে, এত বেশি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে যে এই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে কিনা, তা নিয়ে মানুষের মনে উদ্বেগ ও সন্দেহ থেকে গেছে। এ প্রশ্ন তাদের কাছে স্বাভাবিকভাবেই আসছে যে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটা ঠিকঠাকভাবে হবে কিনা। তবে আমি যতটা দেখেছি, প্রথম দিকের দু-একটা ঘটনার পরে সবাই সংযত হয়েছেন এবং পরিবেশটা ভালোই বলতে হবে। এবার সার্বিকভাবে যে পরিস্থিতি দেখছি, তাতে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ফ্রুটফুল কিছু করা যাবে বলে আমার মনে হচ্ছে না।’

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব ও দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশন শুরু থেকেই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। প্রশাসন নিষ্ক্রিয়। তাদের একটি অংশ একটি দলের দিকে হেলে পড়েছে। তাদের দৃশ্যমান কোনও পদক্ষেপ নেই। তাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে কিনা, সে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এ অবস্থায় ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’’

সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, এখন এই সন্দেহ দূর করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে করতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বীদের পরস্পরের ওপর সন্দেহ ও নজরদারি স্বাভাবিক।’’

তবে যে যাই বলুক, বারবার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কথা জানাচ্ছে সরকার। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘‘আগে কখনও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ভোটকেন্দ্রের ভেতরে যেতে পারতেন না, এবার তাদের সেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে কোনও সমস্যা সৃষ্টি করলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে। নির্বাচনে বাধাদানকারীদের কোনও ছাড় নেই।’’